আমদানি দেখেই লাফিয়ে কমছে কাঁচামরিচের দাম
- আপডেট সময় : ০৭:৪৪:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ জুলাই ২০২৩ ১৪ বার পড়া হয়েছে

আজকের ক্রাইম ডেক্স
ঈদের ছুটির পর কাঁচামরিচের আমদানি শুরু হওয়ায় দ্রুত কমতে শুরু করেছে দাম। ঈদের ছুটির পর গতকাল রোববার প্রথম কর্মদিবসেই ভারত থেকে ১০৫ টন কাঁচামরিচ আমদানি করা হয়েছে। আরও অনেক কাঁচামরিচভর্তি ট্রাক পথে রয়েছে। এ কারণে গতকাল দিনাজপুরে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা দরে। অনেক জায়গাতেই দাম কমে অর্ধেকে নেমেছে। তবে এখনও বেশিরভাগ জায়গায় আমদানি মূল্যের কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আমদানি ব্যয়, শুল্কসহ ভারত থেকে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ আসছে ৭০ টাকায়।
ভোক্তা-সংশ্লিষ্টরা বলেন, সরকারের উচিত আমদানিকারকরা কত দামে আমদানি করছেন, অন্যান্য খরচসহ কত দাম পড়ছে তা খতিয়ে দেখা। তাহলে বাজারে কাঁচামরিচের দাম নাগালে আসতে বাধ্য।
শনিবার ঢাকায় কাঁচামরিচের কেজি বিক্রি হয়েছিল ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। তবে গতকাল রোববার ঢাকার হাতিরপুল, তেজকুনিপাড়া ও কারওয়ান বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে। কোথাও আবার আগের কেনা কাঁচামরিচ ৬০০ টাকায়ও বিক্রি হতে দেখা গেছে।
তবে প্রতিবেশী ভারতে দাম অনেক কম। ভারতের কমোডিটি ইনসাইট বলছে, দেশটির শিয়ালদহে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ গড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ রুপিতে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৬ টাকা।
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে গতকাল ৬০ টন কাঁচামরিচ এসেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও আমদানিকারকদের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এসব কাঁচামরিচের দাম পড়ছে প্রতি টন ৫০০ ডলার। এর সঙ্গে শুল্ক বাবদ প্রতি টনে ১০৮ ডলার খরচ হচ্ছে। এ হিসাবে প্রতি টনের দাম পড়ে ৬০৮ ডলার। প্রতি ডলার ১১২ টাকা ধরে প্রতি কেজির দাম পড়ে ৭২ টাকার মতো।
বেনাপোল বন্দর দিয়ে গতকাল ৪৫ টন কাঁচামরিচ এসেছে। ঢাকা ও খুলনার তিনটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এসব কাঁচামরিচ এনেছে। ইতোমধ্যেই তা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) আব্দুল জলিল জানান, সীমান্তের ওপারে আরও কয়েক ট্রাক কাঁচামরিচ ঢোকার অপেক্ষায় আছে। বেনাপোল কাস্টম হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা কলিমুল্লাহ বলেন, প্রতি কেজি কাঁচামরিচের আমদানিমূল্য ০.২১৫ মার্কিন ডলার, বা ২৩ টাকা ৯৩ পয়সা। আর প্রতি কেজির বিপরীতে শুল্ক দিতে হয়েছে ৩৮ টাকা ৮২ পয়সা। এ ছাড়া প্রতি কেজিতে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ হয়েছে প্রায় ৪ টাকা। ঢাকায় পৌঁছাতে খরচ হতে পারে আরও প্রায় ৩ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতি কেজিতে খরচ পড়বে প্রায় ৭০ টাকা। এর সঙ্গে পাইকার, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীর মুনাফা ৩০ টাকা ধরলে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজির দাম ১০০ টাকার মতো হওয়ার কথা।
তবে আমদানিকারকরা দাবি করেছেন, তাঁদের প্রতি কেজি কাঁচামরিচের আমদানি খরচ পড়ছে ১২৮ থেকে ১৩০ টাকা। আমদানিকারকদের এ দর মেনে নিলেও প্রায় চার গুণ বেশি দামে ক্রেতাকে কাঁচামরিচ কিনতে হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন সমকালকে বলেন, আমদানিতে বিলম্ব অনুমতির কারণে ব্যবসায়ীরা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানিতে কী পরিমাণ অর্থ খরচ হচ্ছে, সেটাও বিশ্লেষণ করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশীয় উৎপাদন দিয়ে মোটামুটি কাঁচামরিচের চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীর কারসাজির কারণে দেশের কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সে জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের আরও কার্যকর ভূমিকা দরকার। বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর কারসাজি নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হবে।
নাজের হোসাইন বলেন, কাঁচামরিচের এই সংকটের পেছনে সরকারের বাজার তদারকির সঙ্গে যুক্তদের নীরবতাও অনেকটা দায়ী। তদারকি সংস্থাগুলোর ঈদ উদযাপনে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও স্থলবন্দর বন্ধ থাকার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা এই সময়টাকে মোক্ষম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
ঈদের পর গতকাল থেকে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় কাঁচামরিচ ভর্তি ছয়টি ট্রাক সাতক্ষীরায় প্রবেশ করেছে। এতে মোট ৬০ টন মরিচ এসেছে। আরও কয়েকটি ট্রাক আসার পথে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এ এস এম মাকছুদ খান। অল্প সময়ে কাঁচামরিচের দাম কমে যাবে বলে জানান তিনি।
সাতক্ষীরা কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম বাবু বলেন, সেখানে খুচরা বাজারে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা কেজি। তবে দাম কমতে শুরু করেছে পাইকারি বাজারে। দু-একদিন গেলে একেবারে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় চলে আসবে বলে জানান তিনি।
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ৪২০ টাকার কাঁচামরিচ ১০০ টাকার নিচে নেমে এসেছে। হঠাৎ করে দাম পড়ে যাওয়ায় অবাক হয়েছেন কৃষকরা। তবে কী কারণে মরিচের দাম এত বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তাও জানা নেই কৃষকদের। দাম কম দেখে বেশি দামের আশায় অনেক কৃষককে মরিচ বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে দেখা যায়।
গতকাল পার্বতীপুরের মরিচের হাট হাবড়া ইউনিয়নের ফরিদপুর, মোমিনপুর ইউনিয়নের যশাই ও হামিদপুর ইউনিয়নের খয়েরপুকুর হাট ঘুরে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় প্রতি মণ কাঁচামরিচ বেচতে দেখা যায় কৃষকদের। অথচ এক দিন আগে শনিবার বিক্রি হয়েছিল প্রতি মণ ১৭ হাজার টাকা পর্যন্ত।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহীনুর আলম বলেন, ঈদের আগে ও পরে অনেক চাষি শ্রমিকের অভাবে মরিচ তুলতে পারেননি। এ কারণে মরিচের আমদানি কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছিল। শনিবার ৭ টন মরিচ কিনে ৪ লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন। গতকাল কিনছেন সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা মণ হিসাবে।
কাঁচামরিচ উৎপাদনের জেলা বগুড়ায় দাম কমতে শুরু করেছে। কেজিতে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে মরিচের দাম। এক দিন আগেও ৬০০ টাকায় বিক্রি হওয়া কাঁচামরিচ গতকাল রোববার বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকা কেজিতে। সব বন্দর দিয়ে কাঁচামরিচ আমদানি শুরু হলে দাম কমবে বলে জানান বিক্রেতারা।
গতকাল বগুড়া শহরের রাজাবাজার ও ফতেহ আলী বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি কাঁচামরিচ খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা কেজিতে। সকালে মহাস্থান হাট থেকে মরিচ আসার পর খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়।
বগুড়া রাজাবাজার আড়তদার ও ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, ঈদের জন্য ছয় দিন হিলি বন্দর, বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দর বন্ধ ছিল। যার কারণে এলসি করা মরিচের ট্রাক দেশে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে ট্রাক প্রবেশ করামাত্রই মরিচের দাম কমে যাবে।
এদিকে আমদানির পরও অনেক জায়গায় আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। খুলনায় দাম এখনও কমেনি। ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে।
ঝিনাইদহে কৃষক থেকে কয়েক হাত ঘুরেই পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা হয়ে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বেড়ে মরিচ বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণ দামে। খুচরা বাজারে মরিচের কেজি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। অথচ কৃষক দাম পাচ্ছেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। এ জন্য পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের সিন্ডিকেটকেই দায়ী করছেন কৃষক ও কৃষি বিভাগ।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূর-এ-নবী জানান, কিছুদিন আগের তাপদাহ এবং কয়েক দিনের ঘন ঘন হালকা বৃষ্টির কারণে কিছুটা সমস্যা হলেও এত দাম বৃদ্ধির মতো কোনো সংকট তৈরি হয়নি। ক্ষেত থেকে নিয়মিতই মরিচ তুলে বাজারে আনছেন কৃষক। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট এবং গুজবের কারণেও দাম বাড়তে পারে।
সিলেটে শনিবার পাইকারি বাজারে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়ার পর গতকাল ৫২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নগরীর মরিচ বিক্রেতারা জানান, কাঁচামরিচের দামের খুব একটা হেরফের হয়নি। দাম কমতে সময় লাগবে।


























