ডোপ টেস্টে টাকার খেলা ফলাফলে নয়ছয়
- আপডেট সময় : ০৮:১৮:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর ২০২২ ৭০ বার পড়া হয়েছে

আজকের ক্রাইম ডেক্স : ‘টাকায় কি না হয় ভাই, টাকায় বাঘের চোখও মেলে। আর ডোপ টেস্ট তো কোনো বিষয়ই না। ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা দিলে আপনার কিছুই করতে হবে না। সবই আমরা করে দেব’-এমনটাই বলছিলেন মিরপুর বিআরটিএ অফিসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিরাজ নামে ২৬ বছরের এক তরুণ।
লাইসেন্সধারী চালক ২০ লাখ, ৯ মাসে পরীক্ষা হয়েছে ১২ হাজারের
প্রায় একই সময়ে বিআরটিএ কার্যালয়ে দায়িত্বরত আনসার সদস্য রানার সহযোগিতা চাইলে তিনি বললেন, ‘ডোপ টেস্ট করার জন্য ফরম পূরণ, তথ্য কেন্দ্র থেকে স্মারক নম্বর বসানো এবং মোটরযান পরিদর্শকের স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য ২০০ টাকা লাগবে।’
এসব সেবায় টাকা কেন লাগবে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিআরটিএতে কাজ করতে আসছেন আর টাকা দেবেন না?’ কিন্তু বিআরটিএর নির্ধারিত হাসপাতালে ডোপ টেস্টের জন্য ৯০০ টাকা ফি নির্ধারিত থাকলেও গুনতে হচ্ছে তিনগুণ টাকা।
গত ৬ নভেম্বর সেখানে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক লোকের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, বিআরটিএর কাজে যারা আসে তারা হয় দালাল চক্র বা অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে কাজ করছে। টাকা ছাড়া এখানে প্রায় কোনো কাজ হয় না।
এমনকি ডোপ টেস্টের (মাদকাসক্ত পরীক্ষা) মতো আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও এখানে ‘নয়ছয়’ হচ্ছে বলে জানা যায়।
টাকায় পাল্টে যাচ্ছে ডোপ টেস্টের রিপোর্ট বা ফলাফল। যদিও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ওই দিন ডোপ টেস্টের বিষয়ে সরেজমিন কথা হয় ইব্রাহিম নামে মিরপুরের এক বাসিন্দার সঙ্গে। তিনি জানান, পেশাদার চালক হিসেবে ডোপ টেস্টের জন্য ১০ টাকা দিয়ে একটা ফরম কিনেছেন, পরবর্তী কার্যক্রম এখন সারতে হবে।
এ প্রতিবেদকও পরিচয় গোপন রেখে নিজেও একটি ডোপ টেস্টের ফরম কিনে নিয়ে ইব্রাহিমকে অনুসরণ করতে থাকেন। এ সময় দেখা যায়, ডোপ টেস্টের ফরম পূরণ করার জন্য তাকে আবার দিতে হয়েছে ৫০ টাকা।
পরে সেটি নিয়ে তথ্য কেন্দ্রে গেলে দুপুরের খাবারের বিরতির কথা বলে কাজ বন্ধ রাখেন সংশ্লিষ্টরা। পরে আরও ২০০ টাকা দিয়ে সেখান থেকে স্বাক্ষর করিয়ে ১১২ নম্বর রুমে যান।
ওই কক্ষের কর্মকর্তার স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে আবার দিতে হয় ৫০০ টাকা। এভাবে বেশ কিছু সময় পর্যবেক্ষণকালে বিআরটিএতে দেখা যায়, ডোপ টেস্টের বিভিন্ন পর্যায়ে ‘টাকার খেলা’।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নতুন আইন অনুসারে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য মাদক সেবন করেন না, এমন সনদ থাকতে হবে। যাকে বলা হচ্ছে-ডোপ টেস্ট।
বিআরটিএর আদেশে বলা হয়েছে, গত ৩০ জানুয়ারি থেকে পেশাদার মোটরযান চালকদের নতুন লাইসেন্স গ্রহণ এবং নবায়নের জন্য ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। লাইসেন্স পেতে হলে ডোপ টেস্টের নেগেটিভ সনদ দাখিল করতে হবে। অন্যথায় নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হবে না বা নবায়ন করা হবে না।
কিন্তু এখানেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্নীতি। কেউ মাদক সেবন না করেও হচ্ছেন মাদকসেবী, আবার কেউ প্রতিদিন মাদক সেবন করেও হচ্ছেন না মাদকসেবী। টাকা বা ‘লিঙ্ক’ থাকলে পেয়ে যাচ্ছেন নিমেষেই ডোপ টেস্টের সনদ। এ ছাড়াও ডোপ টেস্টের জন্য নির্বাচিত হাসপাতালে গেলেও দেখা যায় মারাত্মক ভোগান্তির চিত্র।
গত ১০ নভেম্বর দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারে ডোপ টেস্টের খোঁজখবর নিতে গেলে সেখানে সাক্ষাৎ হয় আবদুর রহমানের সঙ্গে। ৪৬ বছর বয়সি এ গাড়িচালক ডোপ টেস্টের জন্য এসেছেন কুড়িগ্রাম থেকে।
তিনি বলেন, ‘দ্রুত রিপোর্টের আসায় এ হাসপাতালে ডোপ টেস্ট করতে এসে পড়তে হয়েছে মহাভোগান্তিতে। বিশাল সিরিয়াল, আবার দালাল চক্রের তৎপরতাও রয়েছে। শুনেছি, এখানে ডোপ টেস্ট পজিটিভ হলেও নেগিটিভ করা যায়। আবার টাকা দিলে দুই-তিনবারও টেস্ট করা যায়।’
ওই হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, ডোপ টেস্টের জন্য বরগুনা থেকে আসা মাহফুজ নামে এক ব্যক্তি বসে আছেন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তিনিও বিআরটিএর ড্রাইভিং লাইন্সের জন্য ডোপ টেস্ট করাতে নির্ধারিত ওই হাসপাতালে আসেন।
কিন্তু বিগত দুই দিন ধরে হাসপাতালে এলেও ডোপ টেস্টের স্যাম্পল দিতে পারেননি। কেবল আবদুর রহমান কিংবা মাহফুজ নন, এমন আরও অনেকের সঙ্গে কথা বললে তারাও প্রায় অভিন্ন অভিযোগ করেন।
এসব বিষয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের ইনচার্জ ডা. হারুন বলেন, ‘এখানে এখন কোনো দালাল নেই।
আগে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং কয়েকজন দালালকে আটক করে পুলিশেও দিয়েছি। এ ছাড়া ডোপ টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।’ তিনি জানান, আগে ১৫০-২০০ জনের মতো ডোপ টেস্ট করা হতো। কিন্তু এখন প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০ জনের মতো ডোপ টেস্ট করা হয়।
বিআরটিএর বেশির ভাগ চালক এখানে ডোপ টেস্টের জন্য আসেন। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্যাম্পল নেওয়া হয়। আর দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত ডোপ টেস্টের রিপোর্ট দেওয়া হয়। এ অবস্থার মধ্যে আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করছি।
এদিকে গত মঙ্গলবার ডোপ টেস্টের আরেক নির্ধারিত হাসপাতাল জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে গেলে কথা হয় নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা তরিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, অন্য হাসপাতালে অনেক ভিড় থাকায় এ হাসপাতালে ডোপ টেস্ট করার জন্য এসেছেন। এখানে অনেক আগেই সিরিয়াল দেওয়া ছিল। তাই ওই দিন ডোপ টেস্টের জন্য প্রস্রাবের নমুনা দেওয়ার পর ফলাফল বা সনদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারিকুল। কিন্তু তার ফলাফল দেওয়া হয়নি। কিট ও লোকবল সংকট থাকায় আরও সময় লাগবে বলে তাকে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার সময়ের আলোকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের প্যাথলজি পরীক্ষাগারের ক্ষমতা সীমিত। সেখানে মাত্র দুজন টেকনিশিয়ান। ওই দুজনকে অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগের রোগীর নমুনা ছাড়াও কোভিড-১৯ শনাক্তের জন্য নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। সে কারণে দৈনিক সর্বোচ্চ ২০ জন মোটরযান চালকের ডোপ টেস্ট করা সম্ভব। এসব সীমাবদ্ধতা নিয়েই আন্তরিকভাবে কাজ করা হচ্ছে।’
ডোপ টেস্ট-সংশ্লিষ্টরা জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ঢাকায় ডোপ টেস্টের জন্য ছয়টি সরকারি হাসপাতাল নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলো হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। এখানে ডোপ টেস্টের জন্য পেশাদার চালকদের সরকারি ফি হিসেবে দিতে হয় ৯০০ টাকা।
এ ছাড়াও বিশেষ হাসপাতাল হিসেবে ডোপ টেস্ট করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ব^বিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ)। যেখানে ফি বাবদ দিতে হয় দুই হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে সরকারি নিয়োগসংক্রান্ত ডোপ টেস্টের জন্য সারা দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অনুমোদিত বিভাগীয় শহরেও মোট ২২টি ল্যাব বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে বিআরটিএর লাইসেন্সধারী চালক আছেন ২০ লাখের বেশি। এর মধ্যে গত ৯ মাসে ডোপ টেস্ট পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ১২ হাজার চালকের। গত ৩০ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ ডোপ টেস্ট কার্যক্রমটির এখন পর্যন্ত আনুপাতিক হার অত্যন্ত শোচনীয়।
বিআরটিএ পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, ‘আমরা চালকের লাইসেন্স দেওয়ার সময় ডোপ টেস্টের সনদ দেখি। সেই সনদ দেখে লাইসেন্স দেওয়া হয়।
আবার লাইসেন্স নবায়নের সময়ও ডোপ টেস্টের রিপোর্ট নেওয়া হয়। কারও রিপোর্ট নেগেটিভ হলে তার লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না।
তিনি বলেন, ‘ডোপ টেস্টের ক্ষেত্রে দুর্নীতির যে অভিযোগ, তা আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। এ ছাড়া ডোপ টেস্টের বিষয়টি দেখছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
সেখানে যদি কোনো দুর্নীতি থাকে তাহলে সেটির দায়ভার তাদের। মাত্র ছয়টি হাসপাতালে এই ডোপ টেস্ট করানোর কারণে একটু ভোগান্তির ঘটনা ঘটছে। তবে আমরা কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালেও ডোপ টেস্টের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরে কথা বলছি।’
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র ও লাইন ডিরেক্টর (অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. মো. রোবেদ আমিন বলেন, ‘অ্যালকোহল পরীক্ষার কিটের স্বল্পতা আছে।
এ কারণে সরকারি অধিকাংশ হাসপাতাল এ পরীক্ষা করতে পারছে না। বেসরকারি হাসপাতালে এ পরীক্ষা চালু হলে মানুষের হয়রানি কম হবে।’
ডোপ টেস্ট করার বাধ্যবাধকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘ডোপ টেস্ট এভাবে করলে সমাধান হবে না। অ্যালকোহল পরীক্ষার পদ্ধতিগত বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে। কেননা অ্যালকোহল বেশি সময় মানুষের শরীরে থাকে না।
গাঁজা ছাড়া অন্য মাদকদ্রব্য সেবন বা খাওয়ার ৭২ ঘণ্টা পর পরীক্ষা করলে তখন মাদক গ্রহণের বিষয়টি শনাক্ত হয় না। এ ছাড়াও নতুন কিছু মাদক আছে, যা শনাক্তের ব্যবস্থাও নেই। অর্থাৎ মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদক সেবনের ৭২ ঘণ্টা পর গিয়ে যদি ডোপ টেস্ট করেন তাহলে “নেগেটিভ” ফলাফল আসবে।
তাহলে ডোপ টেস্টের যে উদ্দেশ্য সেটি সফল হবে না। বরং পথেঘাটে মাদকাসক্ত সন্দেহজনক চালক পেলে সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’ এতে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও বরেণ্য অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘সরকার অনেক ভালো উদ্যোগ নেয়, সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু ছোটখাটো কারণ বা নানা অজুহাতে অনেক কিছু বাস্তবায়ন হয় না। আমার কথা হলো, গাড়ির চালকেরা সহজে যেন এ সনদ পেতে পারেন, তার জন্য সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা করতে হবে। এটাই জরুরি।’


























