অগ্রিম সতর্কতা: শুরু হওয়ার আগেই ৭,০০০ রিংগিতের নতুন 'ভিসা ফাঁদ' পাকাচ্ছে সিন্ডিকেট
অগ্রিম সতর্কতা: শুরু হওয়ার আগেই ৭,০০০ রিংগিতের নতুন ‘ভিসা ফাঁদ’ পাকাচ্ছে সিন্ডিকেট
- আপডেট সময় : ০৯:২৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে

ঢাকা / কুয়ালালামপুর — বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোদমে শুরু হওয়ার আগেই নেপথ্যে বিশাল এক চাঁদাবাজির নীল নকশা তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট চক্র। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সাধারণ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কোণঠাসা করে প্রতি কর্মীর বিপরীতে ৭,০০০ থেকে ৯,০০০ রিংগিত (প্রায় ২ লক্ষ টাকার বেশি) পর্যন্ত অবৈধ প্রিমিয়াম আদায়ের গোপন পরিকল্পনা সম্পন্ন করেছে এই চক্রটি। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই প্রক্রিয়া এখনই রুখে না দিলে মালয়েশিয়াগামী হাজার হাজার শ্রমিক মালবাহী ফ্লাইটে ওঠার আগেই এক ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী ঋণগ্রস্ততার মুখে পড়বেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই আসন্ন সিন্ডিকেট ব্যবস্থাটি মূলত নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রিত পোর্টাল অ্যাক্সেস এবং কোটা কুক্ষিগত করার ওপর ভিত্তি করে ছক আঁকা হয়েছে। নির্দিষ্ট গুটিকয়েক লাইসেন্সধারী এজেন্সিকে ‘গেটকিপার’ বানিয়ে অন্য ছোট এজেন্সিগুলোকে কালোবাজারি মূল্যে চড়া দামে ‘ডিমান্ড লেটার’ (নিয়োগপত্র) কিনতে বাধ্য করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই অগ্রিম কালোবাজারির পুরো আর্থিক বোঝা পরবর্তীতে পদ্ধতিগতভাবে চাপিয়ে দেওয়া হবে মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক নিরীহ চাকরিপ্রত্যাশীদের কাঁধে। এই বিশাল অংকের অবৈধ লেনদেন বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল এড়াতে মূলত হুন্ডি নেটওয়ার্ক এবং অফশোর শেল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পাচারের সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি ফর মাইগ্রেন্টস (BCSM) এবং মালয়েশিয়ার মানবাধিকার সংগঠন ‘তেনাগানিতা’ (Tenaganita)-সহ অভিবাসন অধিকার রক্ষা জোটগুলো এই আসন্ন সংকট নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সতর্ক করেছে যে, কর্মী নিয়োগের মূল প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই যদি এই ৭,০০০ রিংগিতের অবৈধ প্রিমিয়াম ব্যবস্থা বন্ধ করা না যায়, তবে এটি মাঠপর্যায়ে বাধ্যতামূলক শ্রম, বেতন কর্তন এবং পাসপোর্ট জিম্মি করার মতো মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ তৈরি করবে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বর্তমানে এই সম্ভাব্য সিন্ডিকেটকে রুখতে একটি আগাম “ক্লিন সোর্সিং করিডোর” (Clean Sourcing Corridor)-এর প্রস্তাব করছেন। যেখানে বেসরকারি এজেন্সির একচেটিয়া আধিপত্য ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পুরোপুরি বাদ দিয়ে সরাসরি সরকারি জিটুজি (G2G) ম্যাচিং পোর্টাল এবং একটি বাধ্যতামূলক “এমপ্লয়ার-পেইস এসক্রো সিস্টেম” (Employer-Pays Escrow system) চালুর দাবি জানানো হচ্ছে। এই সিস্টেমে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সমস্ত খরচ আগেই পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে, ফলে কর্মীর কোনো বাড়তি ব্যয়ের সুযোগ থাকবে না।
বিদেশে চাকরিপ্রত্যাশী কর্মীদের জন্য অগ্রিম সতর্কতা ও জরুরি নির্দেশিকা
আসন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর আপনি যেন কোনোভাবেই অবৈধ সিন্ডিকেট ও প্রতারণার ফাঁদে না পড়েন, তার জন্য এখনই নিচের নিরাপত্তা প্রোটোকলগুলো ভালোভাবে জেনে রাখুন এবং কঠোরভাবে মেনে চলুন:
● অগ্রিম কোনো নগদ অর্থ বা বুকিং মানি দেবেন না: বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে “নিয়োগকর্তা সমস্ত খরচ বহন করবেন” (Employer-Pays) নীতি অনুসরণ করে। প্রক্রিয়া পুরোপুরি শুরু হওয়ার কথা বলে কোনো স্থানীয় দালাল বা এজেন্সিকে অগ্রিম নগদ টাকা বা অলিখিত ব্যাংক ট্রান্সফার করবেন না।
● অফিসিয়াল ডাটাবেস চালুর অপেক্ষা করুন: আপনার চাকরির বরাদ্দ এবং পাসপোর্টের বিবরণ সরাসরি সরকারি ডাটাবেসে (যেমন বাংলাদেশের বিএমইটি – BMET পোর্টাল বা গন্তব্য দেশের অনুমোদিত পোর্টাল) আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হওয়ার আগে কোনো এজেন্সিকে পাসপোর্ট বা নথিপত্র জমা দেবেন না। ডিজিটাল প্রোফাইল ছাড়া যেকোনো মৌখিক প্রস্তাবই ভুয়া।
● ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বাইরে কোনো লেনদেন নয়: যেকোনো ধরনের বৈধ প্রশাসনিক চার্জ বা মেডিকেল ফির জন্য সর্বদা একটি ভেরিফায়েড ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ট্র্যাকিংযোগ্য লেনদেন করুন। হুন্ডি বা হাওয়ালার মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে কোনো টাকা পাঠাবেন না, কারণ এতে প্রতারিত হলে আপনার পক্ষে আইনি লড়াই করার কোনো প্রমাণ থাকবে না।
● চুক্তিপত্র নিজে ভালোভাবে যাচাই করুন: কোনো খালি কাগজে সই করবেন না বা এমন কোনো চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করবেন না যার ভাষা আপনি পুরোপুরি বোঝেন না। স্বাক্ষর করার আগে আপনার মূল বেতন, আবাসন সুবিধা এবং কাজের ধরণ পূর্বের প্রতিশ্রুতির সাথে মিলছে কিনা তা যাচাই করে নিন।
● সিন্ডিকেটের অতিরিক্ত ফি দাবি করলে রিপোর্ট করুন: নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর কোনো এজেন্সি যদি সরকারের নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ৭,০০০ রিংগিত বা যেকোনো বাড়তি অর্থ দাবি করে, তবে অবিলম্বে সেই এজেন্সির নাম ও লাইসেন্স নম্বর জাতীয় দুর্নীতি দমন কমিশন এবং স্থানীয় অভিবাসী সহায়তা প্রদানকারী এনজিও (যেমন ব্র্যাক বা তেনাগানিতা)-কে জানান।

























