কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সরকারি টাকা লোপাট, ফোনালাপের অডিও ভাইরাল। আজকের ক্রাইম-নিউজ
- আপডেট সময় : ০৯:৫৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ২২৮ বার পড়া হয়েছে

আজকের ক্রাইম ডেক্স
বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (৪০ দিন) প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সুবিধাবঞ্চিত অতিদরিদ্র শ্রমিকদের পরিবর্তে ড্রেজার, ভটভটি, ভেকু ও চুক্তিভিক্তিক শ্রমিক দিয়ে প্রকল্পের নামমাত্র বাস্তবায়ন দেখিয়ে অর্থ লোপাটের মহোৎসব চালাচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা।
স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রকল্পে লাগামহীন দুর্নীতি করে উপজেলার জল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সদস্যরা কিভাবে অর্থ লোপাট করেছেন তার একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।
সরকারি কাজে দুর্নীতি-অনিয়ম করে ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে টাকা ভাগাভাগির ওই ফোনালাপের রেকর্ড বুধবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টা ৩২ মিনিটে “মোঃ জুনায়েদ সিদ্দিক” নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা হয়।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার (ভাইরাল) পর সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। এমনকি ওই ইউপির দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান বেবী রানী হালদারসহ অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে গোটা উপজেলা জুড়ে চলছে তীব্র সমালোচনা। ভাইরাল হওয়া ১৯ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড’র অডিও রেকর্ডটি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার একাধিক সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন জল্লা ইউপির ৪,৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের নারী সদস্য দিপালী হালদার। এমন অভিযোগে সম্প্রতি নারী সদস্য দিপালী হালদারের বিরুদ্ধে ইউপি চেয়ারম্যান বেবী রানী হালদারসহ সকল সদস্যরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট অনাস্থা দেন এবং কয়েকদিন পরেই স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে তাকে (দিপালী) কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক সপ্তাহ আগে নারী সদস্য দিপালী হালদার তার বিরুদ্ধে দেয়া অনাস্থা সম্পর্কে জানতে চেয়ে চেয়ারম্যান বেবী রানী হালদারের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে কল করে কথা বলেন। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া অডিও রেকর্ডটি সেই ফোনালাপের।
এতে নারী সদস্য দিপালী হালদার তার বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তার নিকট অনাস্থা দেয়া সম্পর্কে ইউপি চেয়ারম্যান বেবী রানী হালদারকে প্রশ্ন করে বলেন, ‘মামী আপনি শুধু শুধু মেম্বারদের দিয়ে আমার বিরুদ্ধে যে কমপ্লেইন দিলেন, আর আপনিও সই দিলেন, এটা ভালো হইলো।’
উত্তরে চেয়ারম্যান বেবী হালদার বলেন, ‘ মানে কি, তুমি আমারে দোষো কেনো, খালি খালি কমপ্লেইন দিছি মেম্বারদের দিয়া, এডা কেমন কথা।’
এসময় অপর প্রান্ত থেকে সদস্য দিপালী হালদার বলেন, ‘এহন শোনেন, আপনে যে টাকা চাইছেন আমার কাছে, আমি দিছিনা আপনারে ?, ৭০ হাজার টাকা দিছি, আগেরবার কর্মসূচির দিছি ৫০ হাজার টাকা। তাইলে আমি কি আপনারে কম দিছি টাকা বলেন?’
এরপর ফোনালাপের একপর্যায়ে চেয়ারম্যানকে সদস্য দিপালী বলেন, ‘আমি কর্মসূচীর টাকা দিছি ৭০ হাজার, আপনি সেটা বলবেন না ইউএনও’কে।’
চেয়ারম্যান বলেন, ‘৭০ হাজার দেও, আর তুমি ৯০ হাজার দেও, সেটা কোনো বিষয় না। তোমার আসবে কত? হিসাব থাকতে হবে কত টাকায় কত আসবে। ৭০ হাজার, আর ৯০ হাজারের কোনো প্রশ্ন না এখানে।’
দিপালী বলেন, ‘না…আপনি বলছেন তোমার উপজেলা চাইছে ৪০ হাজার, আর…দিছি এতো, এটা বলে বলছেন ১ লাখ টাকা। এহন আমি আপনারে ৭০ হাজার টাকা দিছি, আগের বিলে দিছি ৫০ হাজার টাকা।’
চেয়ারম্যান বলেন, “কিসের তোমার ১ লাখ টাকা, তোমার পারসেনটিস কত আসবে সেটা জানে সচিব, তা তো আমিও জানি না এখনও। আর উপজেলা দিয়া ধরছে তোমার এবং চেয়ারম্যানের দুইডা প্রজেক্টে তাদের বেশি অভিযোগ, আর সব প্রজেক্ট তো দেখে নাই সেদিন।
তারা ৩-৪ টা প্রজেক্ট দেখছে, তার মধ্যে এই ২টা প্রজেক্টে বেশি অভিযোগ তাদের। পিআইও (অয়ন সাহা) লিখে দিছে, চেয়ারম্যানের প্রজেক্টে ১ লাখ ১০ হাজার, আর তোমার প্রজেক্টে দিছে ৯০ হাজার। এই দুইটা প্রজেক্ট দিয়া আমরা এইডা…দাবি করি।
আর অন্য প্রজেক্ট বাদ-ই দিলাম, এইডা আমরা দাবি করি, এই ২ লাখ টাকা। তো অন্যান্য মেম্বাররা, তারা যে… ১০/১৫ হাজার করে দিছে, তারাই তো ভালো। এখন আমি তো…এরপরে সবাই মিলে আমারে ধরছে ৭০ হাজার, তোমারে ধরছে কত, ৫০ না, জানি কত হাজার।”
তখন সদস্য দিপালী হালদার প্রশ্ন করে চেয়ারম্যানকে বলেন, আমারে টাকা ধরছে কে, আপনি ?
চেয়ারম্যান বেবী হালাদার তখন ওই নারী সদস্যকে বলেন, “ সবাই মিলে, সব মেম্বাররা… ১০-১৫ হাজার টাকা করে, যার যার কাজের মানের ওপর। আমারে একারে ধরছে ৭০ হাজার, আমি সেই ৭০ হাজার টাকা দিয়ে দিছি, একেবারে নগদ দিছি,… সচিবের কাছে ৭০ হাজার টাকা জমা। আর উপজেলার টাকার সাথে পারসেনটিসের টাকার কি যোগাযোগ, তুমি আগে পারসেনটিস বাবদ ৫০ হাজার টাকা দিয়া দিছো। আর শেষে তুমি ২০ হাজার টাকা দিছো, এখন তোমার কাছে পারসেনটিসের হিসাবে আরও পায়।”
এবার সদস্য দিপালী বলেন, ‘আমি একবার ৭০ হাজার, পরে ৫০ হাজার টাকা দিছি, ওই কাজে আমি মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিছি, আর কত দিবো ? এজন্যই তো রাগ হয়ে বলছি, আমি আর টাকা দিতে পারবো না।’
এমন কথা শুনে দুর্নীতিবাজ এই চেয়ারম্যান ওই সদস্যকে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “ আমি চেয়ারম্যান হইয়া আমি ৭০ হাজার টাকা দিতে পারছি, আমার স্বামী (নিহত চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালাদার নান্টু) এতো টাকা ঋণ-দেনা রেখে গেছে, ব্যাংকে…বাড়ি-ঘর সব। আমি সেগুলো দিতে পারছি, আমি চেয়ারম্যান হইয়া।
আর তোমরা মেম্বার হইয়া দিতে পারবা না, তোমরা উপজেলায় গিয়া বুঝবা, এই খানে বুঝবা, ওইখানে বুঝবা। বেশ বোঝো, সমস্যা কি ?”
পরে নারী সদস্য দিপালী ইউপি চেয়ারম্যানকে বলেন, ‘আমাদের কাজ ভালো না হলে তারা (উপজেলা প্রশাসন) বিল দিবে না, কিন্তু ইউএনও, পিআইও আমাদের কাছে এতো টাকা চায় কেন? এগুলো আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন না।’
উত্তরে চেয়ারম্যান বেবী বলেন, “বলতে পারিনা …আবার, বলছি না। সব ইউনিয়ন থেকেই নিছে, যে যে ইউনিয়নের কাজের মান ভালো না, সবাই…ই দিছে, কম আর বেশি। এখন.. জল্লা ইউনিয়নের কাজ যথেষ্ট খারাপ কইছে। জল্লা থেকে ২ লাখ টাকার কম তারা (উপজেলা প্রশাসন) নিবেই না, আমি দেড় লাখ টাকা নিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে ঘুরতেছি।
তারা (উপজেলা প্রশাসন) কোনো টাকাই ধরে না, ২ লাখ টাকার এক টাকাও কম নিবেনা। ইউএনও’র থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত টাইম নিছিলাম, যে এর মধ্যে টাকা দিয়ে দিবো। শেষে আমারে ইউএনও পর্যন্ত ধরছে সেই টাকার জন্য। আগে তো…পিআইও’র সাথে সচিবের সাথে কথা হতো। আমার সাথে বেশি কিছু বলে নাই। এখন তো ইউএনও সরাসরি সেদিন আমারে ধরছে, যে আপনি সেই টাকা কবে দিবেন। আপনি তারিখ দেন কবে দিবেন।
আমি তারিখ দিয়ে আসছি, গত সপ্তাহের মধ্যে। কিন্তু সেই তারিখ তো শেষ, এখন এই সপ্তাহও যায়। তারা (উপজেলা প্রশাসন) এক টাকাও কম নেবে না।” এসব প্রসঙ্গের পরে দীর্ঘ ওই ফোনালাপের মধ্যে এই দুই জনপ্রতিনিধি স্থানীয় রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কথা বলেন।
একপর্যায়ে রাগান্বিত হয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বেবী রানী হালদার অশ্লীল ভাষায় বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ-এমপি’কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন।
এসব বিষয়ে জল্লা ইউপি চেয়ারম্যান বেবী রানী হালদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘পরিষদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নারী সদস্য দিপালী হালদারকে ব্যবহার করে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে।
এ ঘটনাও ষড়যন্ত্রের অংশ।’ এসময় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহকে নিয়ে ফোনালাপের মধ্যে আপত্তিকর মন্তব্যের বিষয়টি অস্বীকার করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি চেয়ারম্যান বেবী রানী হালদার।
এদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) অয়ন সাহা বলেন, কাজের অসংগতি পেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হতো। আপনি কি প্রকল্পের কাজ তদারকি করে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের নিকট থেকে ঘুষ আদায় করেছেন এবং ফোনালাপে উল্লেখিত টাকা নিয়েছেন এমন প্রশ্নে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, তার (পিআইও) বরাত দিয়ে অন্য কেউ ঘুষ চাইলে সে জন্য তিনি দায় নিবেন না। তবে এ ধরনের ঘটনার সু-নির্দিষ্ট প্রমান পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ এনে জল্লা ইউপির চেয়ারম্যান বেবী রানী হালদারের নিকট ঘুষের ২ লাখ দাবির বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রণতি বিশ্বাস বলেন, ‘ওই চেয়ারম্যান এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট কথা বলেছেন। তার সাথে ওই প্রকল্প নিয়ে কোনো কথা হয়নি। তাছাড়া কোনো কাজেই অনিয়ম মেনে নেয়া হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাইরাল হওয়া ফোনালাপের অডিও রেকর্ডটি সম্পর্কে তার জানা নেই। তবে বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন এবং ওই চেয়ারম্যান কর্তৃক তার (ইউএনও) সম্পর্কে এ ধরনের অপপ্রচারের প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান।
প্রসঙ্গত, ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (৪০ দিন) এই প্রকল্পে উজিরপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ৩০৫৭ জন শ্রমিকের কাজের জন্য ২ কোটি ৫৯ লাখ ১৬ হাজার ৩৭৩ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
২০১৯ সালের ২ অক্টোবর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তৎকালীন উপ-পরিচালক (কাবিখা-৩) সঞ্জীব সূত্রধর স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ বরাদ্দ হয়। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মোট ৬৬টি প্রকল্পের জন্য সরকারের ওই বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে জল্লা ইউনিয়নের ৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৪১ জন শ্রমিকের কাজের জন্য ২৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই ইউপির সবগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করে বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা জনপ্রতিনিধিরা লোপাট করেছেন।
ওই ইউপির ৭টি প্রকল্পের সভাপতি এবং ইউপি চেয়ারম্যান নিজেদের পছন্দের লোককে শ্রমিক দেখিয়ে তাঁদের নামে ব্যাংক হিসাব খুলেছেন। পরে প্রকল্পের সভাপতি কৌশলে এসব শ্রমিকের হিসাব নম্বর থেকে টাকা উত্তোলন করে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করছেন।


























