করতেন ইমামতি ‘নেশা’ ডাকাতি
- আপডেট সময় : ০৯:২৬:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২২ ৯১ বার পড়া হয়েছে

অনলাইন ডেস্ক
মাদ্রাসায় পড়াশোনা। মুখস্থ কোরআনের ২৭ পারা। করেছেন মসজিদে ইমামতি। সাতক্ষীরা সদরের হানিপাড়ায় তার বাড়ি। ৩৮ বছর বয়সী আবু জাফর বিপ্লবই এখন পুলিশের খাতায় ‘ভয়ানক’ ডাকাত! ডাকাতি করতে গিয়ে জোড়া খুনের আসামি হয়ে প্রথমবার দেখেন কারাগারের চার দেয়াল। এরপর বারবার জেল-জামিনে ছকবন্দি হয়ে নিয়মিত হাঁটেন একই পথে। ডাকাতির ‘নেশা’ থেকে বের হতে পারেননি আর।
শেষ পর্যন্ত রাজধানীর উত্তরার আবদুল্লাহপুরে এক চিকিৎসককে বাসে তুলে ডাকাতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এখন রয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে। ডিবির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বিপ্লব অপরাধের ভয়ংকর জগতে পা রাখার বর্ণনা দেন। তার অপরাধের ফিরিস্তি শুনে কর্মকর্তারাও বিস্মিত। নিজে পুরোপুরি হাফেজ হতে না পারলেও মেয়েকে হাফেজ বানাতে চান, এ জন্য ঢাকার সাভারের একটি মাদ্রাসায় ভর্তিও করা হয়েছে মেয়েকে।
গোয়েন্দাদের বিপ্লব জানান, এক মাস পরেই ৩০ পারা কোরআন হেফজে (মুখস্থ) শেষ করে মাদ্রাসা থেকে তার পাগড়ি নেওয়ার কথা ছিল। হঠাৎ তাকে ‘জিনে’ ধরে। এরপর একদিন ভোরে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে যান। তার বাবা তাকে খুঁজে বের করে কবিরাজের কাছে নিয়েছিলেন। কিছুটা সুস্থ হলেও আর মাদ্রাসায় যেতে পারেননি। সাতক্ষীরার ঝাউডাঙ্গা এলাকার একটি মসজিদে কিছুদিন ইমামতি করেন। সেখানেও স্থায়ী হতে না পেরে ২০০২ সালের দিকে পালিয়ে চলে আসেন ঢাকার গাবতলীতে। এরপর বিভিন্ন বাসে পাঁচ থেকে ছয় বছর হেলপারি করেন।
যেভাবে ‘ডাকাত বিপ্লব’ :বিপ্লব জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, মাঝেমধ্যে ঢাকা-আরিচা পথে লোকাল বাসও চালাতেন তিনি। সেখান থেকেই নানা অপরাধী চক্রের সঙ্গে তার হাতেখড়ি। ডিবির তেজগাঁও জোনাল টিমের এক কর্মকর্তা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে বিপ্লব জানিয়েছেন, বাস চালানোর সময় বিপুল নামের এক চালকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বিপুল একদিন মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সাভার থেকে শাহবাগে ফুল পৌঁছে দিতে তিন হাজার টাকায় তার বাসটি ভাড়া নেয়। ওই রাতে বিপুল বাসটিতে ফুল না উঠিয়ে ৮ থেকে ১০ জন যাত্রী তোলেন। এরপর তাকে জিম্মি করে বলা হয়, তারা সবাই ডাকাত। বাস দিয়ে ডাকাতি করবে। বাধা দিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। শেষ পর্যন্ত বাসটির চালকের আসনের নিয়ন্ত্রণ বিপুলের লোকজন নিয়ে রাতভর গাবতলী ও সাভারের রাস্তায় যাত্রী তুলে ডাকাতি করে। এভাবেই সে ধীরে ধীরে বাস ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়ে। সেই বিপুল খুনের মামলায় জড়িয়ে এখন ভারতে আত্মগোপনে রয়েছে বলে দাবি বিপ্লবের।
নিজেই দল গঠন করে হত্যা-ডাকাতিতে :গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে বিপ্লব জানান, তার আর কিছু করার ছিল না। একসময়ে নিজেই দল গঠন করে বাসের যাত্রীবেশে, আবার কখনও প্রাইভেটকারে যাত্রী তুলে ডাকাতি ও ছিনতাই করতে থাকেন। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজের গ্রুপের দুই সদস্য আবির ও শাকিলকে তারা হত্যা করেন। গ্রুপে থেকেও পুলিশের কাছে তথ্য দেওয়ায় ‘অপারেশনের’ কথা বলে তাদের বাসে তোলা হয়। এরপর দু’জনকে গলাটিপে মেরে লাশ গাইবান্ধা মহাসড়কে ফেলে দেওয়া হয়। জোড়া খুনের মামলায় ওই বছরের এপ্রিলে গ্রেপ্তার হয়ে ১৮ মাস কারাগারে থাকেন বিপ্লব। বেরিয়ে ফের প্রাইভেটকার দিয়ে ছিনতাই শুরু করেন। তখন তার সঙ্গী ছিল ইলিয়াস ও আরেক শাকিল। পরে ওই দু’জন বাস ডাকাতির খেপে গিয়ে সাভারের বলিয়াপুরে মিরপুরের হোটেল ব্যবসায়ী রবিউলকে মেরে ফেলে। এরপর তারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলে সঙ্গীর অভাবে মাদকের কারবার শুরু করেন বিপ্লব।
বিপ্লব জানান, ২০১৮ সালে সাভারের ডিবি তাকে হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করে। ওই মামলায় কয়েক মাস জেল খেটে বেরিয়ে ফের ইয়াবা কারবার শুরু করলে ২০১৯ সালে এক হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ আবার র্যাবের কাছে ধরা পড়েন। বেরিয়ে পুরোনো সঙ্গীদের সঙ্গে ফের বাস ডাকাতিতে জড়ান।
কারাগারে ভাত বিক্রির টাকায় জামিন :বিপ্লব বলছিলেন, তার সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে। বারবার গ্রেপ্তার হওয়ায় স্ত্রী সন্তানদের ফেলে অন্যত্র চলে যায়। এর আগে ধারদেনা করে কয়েক দফায় স্ত্রীই জামিন করিয়েছিলেন। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পর ২০১৯ সালে আর কারাগার থেকে বের হতে পারছিলেন না। তবে কারাগারে তিনি বিভিন্ন সেলে রান্না করা ভাত বণ্টনের কাজ পান। সেখানে তার কপাল খোলে। ‘দামি’ কয়েকজন কারাবন্দিকে ওয়ার্ডে উন্নতমানের চালের ভাত সরবরাহ করে তিনি সপ্তাহে এক হাজার করে টাকা পেতেন। ওই টাকা থেকে কারারক্ষীদের কিছু টাকা দিয়ে বাকি টাকা তার কাছে থাকত। এভাবে সেখানে বসেই ৩০ হাজার টাকা জমিয়ে তা হাজিরা দিতে এসে আইনজীবীকে দেন। এরপর জামিনে বের হন। তবে কারাগারের ভেতর বিপ্লবের এই কাজের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভালো হতে চেয়েছিলেন :বিপ্লব আক্ষেপ করেই বলছিলেন, তিনি বড় বড় অপরাধ করলেও বেশিদিন কারাগারের বাইরে থাকতে পারেননি। এ জন্য ভালো হয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলেন। শেষ দিকে প্রাইভেটকার ভাড়া নিয়ে ছিনতাই করে কিছু টাকা পেয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে মেয়েকে ল্যাপটপ কিনে দেন। করোনাকালে মাদ্রাসা বন্ধ থাকায় মেয়ে তা দিয়ে অনলাইনে ক্লাস করে। ছেলেকে একটি ফোনও কিনে দিয়েছেন। তার কাছে দেড় লাখ টাকা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স পরিচয়ে তার সেই টাকা নিয়ে যায় সাভারের একটি দল। এরপর বাধ্য হয়েই পুরোনো লোকজন নিয়ে ফের অপরাধে জড়ান। তবে এবার বের হতে পারলে এই পথ ছাড়বেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহাদত হোসেন সুমা বলেন, গত ২০ জানুয়ারি আবদুল্লাহপুরে চিকিৎসককে বাসে তুলে ডাকাতির ঘটনায় এখন পর্যন্ত বিপ্লবসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সবাই বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে রয়েছে। চক্রটি বারবারই বাস ও প্রাইভেটকারের যাত্রী সেজে ডাকাতি-ছিনতাই করছিল।


























