ঘোড়াঘাটে এক দিনের ৩৬ তম প্রবীণ দিবস পালিত
ঘোড়াঘাটে এক দিনের ৩৬ তম প্রবীণ দিবস পালিত
- আপডেট সময় : ০৩:৪২:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৩৩ বার পড়া হয়েছে

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে পালিত হল ৩৬ তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে দিবসটি উপলক্ষে উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালী বের করা হয়। র্যালিটি উপজেলার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে একই স্থানে গিয়ে শেষ হয়।
এ উপলক্ষে উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় ও কারিতাস বাংলাদেশ দিনাজপুর অঞ্চল এস ডি ডি বি প্রকল্পের যৌথ আয়োজনে দিবসটি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ রুবানা তানজিন।
এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকতা মো. মাসুদ রানা। বিশেষ অতিথির রাখেন, ঘোড়াঘাট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এসএম মনিরুল ইসলাম,উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো.আফজাল হোসেন ,উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সুজন মিয়া, একাডেমিক সুপারভাইজার ধ্বীরাজ সরকার।
এছাড়া বক্তব্য রাখেন, ওসমানপুর কারিতাস ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের ইনচার্জ সিলভিয়া রোজারিও, এস ডি ডি বি প্রকল্পের এনিমেটর আসুন্তা হেম্ব্রম, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি শ্রী সজল চন্দ্র মন্ডল প্রমূখ।
আলোচনা সভা শেষে ৫০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ১টি করে আম ও মেহগনি গাছের চারা প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত সমাজকল্যাণ সংস্থার পক্ষ থেকে বিতরণ করা হয়।
ঢাকঢোল, র্যালি, আলোচনা সভা আর ফুলেল শুভেচ্ছায় পালিত হলো আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। কিন্তু দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর ঘোড়াঘাটের প্রবীণ মানুষের জীবনে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আসে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে। এক দিনের কর্মসূচিতে প্রবীণদের অধিকার ও মর্যাদার কথা উচ্চারিত হলেও বছরের বাকি ৩৬৪ দিন তাঁদের চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা, একাকিত্ব ও পারিবারিক অবহেলার বিষয়গুলো কতটা নজর পায়, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
১ অক্টোবর ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে র্যালি বের হয়ে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা পরিষদ হলরুমে গিয়ে শেষ হয়। পরে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় ও কারিতাস বাংলাদেশ দিনাজপুর অঞ্চলের এসডিডিবি প্রকল্পের যৌথ আয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবানা তানজিন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মজসুদ রানা।
আলোচনা সভায় বক্তারা প্রবীণদের অধিকার, মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। অনুষ্ঠান শেষে ৫০ জন প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে আম ও মেহগনি গাছের চারা বিতরণ করা হয়।
তবে প্রশ্ন উঠছে—অনুষ্ঠানের বাইরে প্রবীণদের জন্য কী আছে?
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঘোড়াঘাটের অনেক প্রবীণের কাছে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসা ব্যয়, নিয়মিত ওষুধ, একাকিত্ব এবং পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় প্রবীণদের অনেকের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় প্রবীণদের অভিযোগ, বয়স্ক ভাতা বা অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা ব্যক্তিরা সহায়তা পেলেও প্রত্যেক প্রবীণের প্রয়োজন একই নয়। কারও প্রয়োজন চিকিৎসা, কারও প্রয়োজন নিয়মিত ওষুধ, আবার কেউ পরিবারে থেকেও কার্যত একা।
প্রবীণ ব্যক্তি মোঃ জহির উদ্দিন (৮০) বলেন, “দিবস এলে আমাদের কথা বলা হয়। কিন্তু সারা বছর অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাই কঠিন হয়ে
আরেক প্রবীণ ব্যক্তি শুকটু মিয়া(৭৫) বলেন, “ভাতা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু টাকা দিলেই প্রবীণের সব সমস্যা সমাধান হয় না। চিকিৎসা ও নিরাপদে চলাফেরার ব্যবস্থাও দরকার।”
ভাতা পেলেই কি দায়িত্ব শেষ?
প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—তালিকাভুক্তি, ভাতা বিতরণ ও প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্তকরণ কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে?
স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াব উদ্দিন (৮৫) বলেন, “প্রবীণদের জন্য নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। কে অসুস্থ, কে একা থাকেন, কার পরিবারে দেখভালের কেউ নেই—এসব তথ্য প্রশাসনের কাছে থাকা উচিত।”
আরেকজন আব্দুর রশিদ (৮০)বলেন, “দিবস পালন ভালো উদ্যোগ। তবে এর সঙ্গে যদি সারা বছর কার্যক্রম থাকে, তাহলে প্রবীণরা বেশি উপকৃত হবেন।”
স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ নজর কতটা?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা ও নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন বাড়ে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে তাঁদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ সহায়তা বা কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ কতটা রয়েছে—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবীণ জসীমউদ্দীন বলেন, “হাসপাতালে যেতে হলে দূর থেকে আসতে হয়। নিয়মিত পরীক্ষা ও ওষুধের ব্যবস্থা থাকলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো।”
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: প্রিয়াঙ্কো কুন্ডু বলেন, “প্রবীণদের জন্য বিদ্যমান স্বাস্থ্য বিষয় অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।”
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নজরদারি জরুরি
সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রবীণ দিবস পালনের কথা বলা হয়েছে। এবারের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল-দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা। জাতিসংঘও দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
অর্থাৎ প্রবীণদের জন্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়—স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ বাসস্থান, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। ডাবলিউ এইচ ও বলছে, প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সেবায় অর্থায়ন, প্রশিক্ষিত কর্মীর ঘাটতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রবীণদের অংশগ্রহণ—এসব জায়গায় এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে।
প্রশাসনের কাছে কয়েকটি সরাসরি প্রশ্ন
ঘোড়াঘাটে মোট কতজন প্রবীণ সরকারি বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন?
কতজন প্রবীণ এখনো তালিকার বাইরে?
গত এক বছরে কতজন নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন?
ভাতা পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রকৃত অসহায় ও একাকী প্রবীণদের সংখ্যা কত?
প্রবীণদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা বিশেষ চিকিৎসা কার্যক্রম কতবার হয়েছে? প্রশাসনের জানা নাই ও নজরদারি নাই।
প্রবীণদের উদ্দেশ্যে উপজেলা সমাজসেবা সেবা কর্মকর্তা মো: মাসুদ রানা বলেন বলেন, “প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি স্থানীয় পর্যায়ের অতিরিক্ত উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও আমরা কাজ করছি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবানা তানজিন বলেন, “প্রবীণরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। কোনো প্রকৃত অসহায় প্রবীণ সরকারি সুবিধার বাইরে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
শুধু প্রবীনদের নিয়ে দিবস পালন, আলোচনা ও কয়েকটি গাছের চারা দিয়েই কর্তব্য দায়িত্ব শেষ হয় না।
একটি র্যালি, একটি আলোচনা সভা কিংবা কয়েকটি গাছের চারা বিতরণ দিয়ে প্রবীণদের দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক প্র hi I’mবীণ দিবসের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন দিবসের আলোচনার বিষয়গুলো বছরের প্রতিটি দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রতিফলিত হবে।
ঘোড়াঘাটের প্রবীণরা তাই শুধু আনুষ্ঠানিক সম্মান নয়
এখন দেখার বিষয়, ১ অক্টোবরের র্যালি ও আলোচনা সভার প্রতিশ্রুতি কি আগামী ৩৬৪ দিনে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ নেয়, নাকি আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসও কেবল একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।























