লকডাউন শিথিলের পথে অনেক দেশ। আজকের ক্রাইম-নিউজ
- আপডেট সময় : ০৯:২৮:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২০ ১৩২ বার পড়া হয়েছে

অনলাইন ডেস্ক:: একদিকে করোনাভাইরাস, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দা—এই উভয় সংকট থেকে বাঁচতে পর্যায়ক্রমে লকডাউন শিথিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনেক দেশ। ফলে উৎপাদনে ফিরতে পারবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কলকারখানা, খুলবে অনেক দোকানপাটও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে কিছু দেশ। তবে শিথিলের ক্ষেত্রে এসব দেশ সামাজিক দূরত্ব কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
আরেকটি স্বস্তির খবর হলো, ‘করোনাভাইরাস ডিজিস ২০১৯’ (কভিড-১৯)-এ বৈশ্বিক আক্রান্তের হার গত পাঁচ দিন ধরে কমছে। স্থিতিশীল আছে দৈনিক মৃত্যুর হারও। অন্যদিকে ইতালিতে প্রায় দেড় মাসের মধ্যে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা গত সোমবার ছিল সবচেয়ে কম। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো আক্রান্ত ও মৃতের হার কমতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রেও। সব মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত বিশ্বের দুই শতাধিক দেশ ও অঞ্চলে অন্তত ২৫ লাখ মানুষের মধ্যে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার মানুষ।
লকডাউনের খোলস ভাঙা শুরু : অভিভাবকরা যেন কর্মস্থলে ফিরতে পারেন, সে জন্য অনেক দেশ শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যাপারে জোর দিচ্ছে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের দেশ ডেনমার্ক একটি উপায় বের করেছে। তারা শুরুতে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্কুল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্কুলের সামনে যে মাঠ আছে, সেটা ফিতা দিয়ে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হবে। শ্রেণিকক্ষে শিশুদের প্রতিটি ডেস্কের দূরত্ব থাকবে ন্যূনতম দুই মিটার। দুই ঘণ্টা পর পর শিশুদের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকবে। শ্রেণিকক্ষের মেঝে, হাত ধোয়ার স্থান, শৌচাগার, দরজার হাতল জীবাণুমুক্ত করা হবে দিনে দুবার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গত সোমবার সেলুন ও ট্যাটুর দোকানও খোলার অনুমোদন দিয়েছে ডেনমার্ক সরকার। তবে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতার কথা জানিয়েছে দেশটি।
এর আগে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা দেয় ইউরোপের আরেক দেশ অস্ট্রিয়া। সেখানে ১৪ এপ্রিল থেকে এমন দোকানপাট খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়, যেগুলোর আয়তন সর্বোচ্চ ৪০০ বর্গমিটার। এ ছাড়া ১ মে থেকে দেশটিতে কিছু বিপণিবিতানসহ সেলুন খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মার্চের শেষদিক থেকে আক্রান্ত ও মৃতের হার কমতে থাকে নরওয়েতে। এ অবস্থায় গত ৭ এপ্রিল দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিছু প্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা দেন। গত সোমবার থেকে কিন্ডারগার্টেন স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ পর খুলবে মাধ্যমিক স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, পার্লার ও সেলুন। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ চালু করে দিলেও জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে সরকার। জার্মানিতে গত সোমবার থেকে এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর আয়তন সর্বোচ্চ ৮০০ বর্গমিটার। ফলে দেশটিতে গাড়ির শোরুম, বাইসাইকেলের দোকান কিংবা লাইব্রেরির মতো প্রতিষ্ঠান খোলা যাবে। এর আগে তিন ধাপে লকডাউন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় সুইজারল্যান্ড। প্রথম ধাপ শুরু হবে ২৭ এপ্রিল। ওই দিন থেকে সেলুন, পার্লার, হার্ডওয়্যার ও ফুলের দোকান খোলা যাবে। ১১ মে দ্বিতীয় ধাপে খুলবে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খুচরা জিনিসপত্রের দোকান। এ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে ৮ জুন মাধ্যমিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি খুলে দেওয়া হবে লাইব্রেরি, জাদুঘর ও চিড়িয়াখানা। এর আগে ইতালি ও স্পেনেও কিছু প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়। এশিয়ায় চীনের পর লকডাউন শিথিল করেছে ইরান ও পাকিস্তানও। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও, ক্যালিফোর্নিয়া ও টিনেসিসহ দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বেশ কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নির্দিষ্ট সময়ে লকডাউন : অধিকাংশ দেশেই দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এই দুই দিন পুরো দেশ লকডাউন রাখার কথা ভাবছে অনেক সরকার। তুরস্ক এরই মধ্যে জানিয়েছে, সাপ্তাহিক ছুটির ৪৮ ঘণ্টা ৩১টি প্রদেশ লকডাউন থাকবে। সপ্তাহের বাকি পাঁচ দিন ২০ বছরের কম কিংবা ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের ঘরে থাকতে হবে। ইউরোপের দেশ সুইডেনে বয়স ৭০ বছরের বেশি হলে ঘরে থাকা বাধ্যতামূলক। লিবিয়ায় সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাইরে বের হওয়া যাবে। এই পাঁচ ঘণ্টা খোলা রাখা যাবে দোকানপাটও। অন্যদিকে ‘লিঙ্গভেদে’ লকডাউন কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেরু। দেশটিতে শুক্র, সোম ও বুধ—এই তিন দিন কেবল পুরুষরা বাইরে যেতে পারবে। শনি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার বের হতে পারবে নারীরা।
‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি সামনে!’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিওএইচও) প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস গত সোমবার প্রেস ব্রিফিংয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্ব যদি এক হয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই না করে, তবে ধরে নিতে হবে যে করোনাভাইরাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ আমরা এখনো দেখিনি।’
দেশে দেশে করোনাচিত্র
১০ মার্চের পর ইতালিতে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে কম ছিল গত সোমবার। এ দিন দেশটিতে আক্রান্ত হয় দুই হাজার ২৫৬ জন; মৃত্যু হয় ৪৫৪ জনের। তবে গতকাল আক্রান্ত (২৭২৯) ও মৃতের (৫৩৪) সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। ৩৬ দিনের মধ্যে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা স্পেনেও সবচেয়ে কম ছিল গত সোমবার। এ দিন দেশটিতে আক্রান্ত হয় এক হাজার ৫৩৬ জন, মৃত্যু হয় ৩৯৯ জনের। কভিড-১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যায় চতুর্থ দেশ হিসেবে ২০ হাজারের ‘মাইলফলক’ স্পর্শ করেছে ফ্রান্স। সোমবারের ৫৪৭ জনসহ দেশটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ২৬৫ জনে। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে দেড় লাখ। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীনে নতুন আক্রান্ত হয়েছে ১১ জন। মঙ্গলবারের ৮৮ জনসহ ইরানে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ২৯৭ জনে। ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৬০৩ জনের। মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে তুরস্কে; ৯৫ হাজার ৫৯১ জন। মৃত্যু হয়েছে দুই হাজার ২৫৯ জনের। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে আট লাখ। মৃতের সংখ্যা ৪৪ হাজারের বেশি। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত নিউ ইয়র্কে; আড়াই লাখের বেশি। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুও সেখানে; প্রায় ১৯ হাজার।
সার্বিক পরিস্থিতি
বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ দিন ধরে বিশ্বে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা কমছে। গত সোমবার বিশ্বে ৭৩ হাজার ৯২৮ জনের মধ্যে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়, যা গত ছয় দিনের মধ্যে সর্বনিম্ন। এদিকে গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ১১টায় বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৯৬ জন। মোট মৃত্যু হয়েছে এক লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৭ জনের। সুস্থ হয়েছে ছয় লাখ ৬৭ হাজার ৫৫২ জন। চিকিৎসাধীন আছে ১৬ লাখ ৮৬ হাজার ২৯৭ জন। এদের মধ্যে মৃদু উপসর্গ রয়েছে ১৬ লাখ ২৮ হাজার ৭০৯ জনের (৯৭ শতাংশ)। বাকি ৫৭ হাজার ৫৮৮ জনের (৩ শতাংশ) অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ছাড়া বিশ্বের প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে ৩২৪ জন। বৈশ্বিক মৃত্যুর হার ৬.৮৬ শতাংশ। সূত্র : ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, বিবিসি, এএফপি, সিএনএন।























