সংবাদ শিরোনাম ::
ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল বৈরী আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও অবৈধ জালে সংকটে সুন্দরবন উপকূলের মৎস্য অর্থনীতি সাগরে নেই ট্রলার, আড়তে নেই মাছ বানারীপাড়ায় বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম রকি তেতলা পিজিএস স্কুলের সভাপতি বরিশালে সিভিল সার্জনের অপসারনের দাবীতে কক্ষে তালা বাবুগঞ্জে মাদক, চুরি-ডাকাতি ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক সভা। বানারীপাড়ায় চাঁদাবাজি মামলায় জামিনে বের হয়ে বাদীসহ তিনজনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম ঝালকাঠিতে গৃহবধূ মলিনা রায় হত্যা: মামলার দ্বিতীয় আসামি ঢাকায় গ্রেফতার সড়কে ঝড়লো সাংবাদিক পুত্রের প্রাণ, বিএমএসএফ’র শোক বাবুগঞ্জে ১ কেজি গাঁজাসহ তিন মাদক কারবারি আটক ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ত্রিমুখী সংঘর্ষে রিকসা চালক নিহত, আহত-১০ ​ঝালকাঠিতে ‘ফ্রি নিউজ গ্রুপ’-এর সাংবাদিকদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত

ইউএনও’র ছোঁয়ায় পাল্টে গেল ২৬ গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ.।

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:০৮:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২০ ১৪৮ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ১৬ টি গ্রামের মধ্য দিয়ে একে বেকে বয়ে গেছে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পাখিমার’ খাল। এই খাল থেকে অন্তত ৭ টি শাখা ইউনিয়নের আরো ১০টি গ্রামে প্রবেশ করেছে। ৫০-৬০ বছর আগে বন্যা ও জলোচ্ছাস থেকে রক্ষা পেতে ‘পাখিমারা’ খালের দুই প্রান্তে বাধ দেয়া হয়। এরপর থেকে শাখা জুগীর খালের মাধ্যমে পাখিমারা খালে আন্ধারমানিক নদের পানি প্রবাহিত হয়ে আসছে। জুগীর খালের এক প্রান্ত আন্ধারমানিক নদে মিলেছে। আরেক প্রান্ত মিলেছে মাখিমারা খালে। খালগুলো মিঠা পানির অন্যতম উৎস। অন্তত ২৬টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ তাদের জীবিকার জন্য এই খালগুলোর ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাদের

তবে কুমিরমারা গ্রামে জুগীর খালের বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরতেন। ফলে পানি প্রবাহে বিঘœ ঘটতো। দখলদারদের কারণে গ্রামের বাসিন্দারা খালের পানি ব্যবহার করতে পারতেন না। খালের পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা নেই, তাই বর্ষা মৌসুমে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময়গুলো আবাদ হতোনা। সেচের অভাবে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। ফলে সেসময় গ্রামগুলোর অধিকাংশ পুরুষ মানুষ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতেন। দুই যুগের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছিল গ্রামের মানুষগুলোর বেচে থাকার লাড়াই।

অবশেষে প্রায় দুই যুগ পর কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমানের হস্তক্ষেপে দখল মুক্ত হয় খাল। তখন খালের পানি ব্যবহারে আর বাধা না থাকলেও দেখা দেয় আরেক সমস্যা। খালের জলকপাটগুলো (¯øুইস গেট) জরাজীর্ন হওয়ায় জোয়ারের লোনা পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হয় খালের দুই পাশের কৃষি জমি। এর ওপর লোনা পানি দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব ছিল না। এবারও তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেন উপজেলা ইউএনও। খালে বাধ নির্মানে সরকারী তহবিল থেকে টাকাও দেন তিনি। গ্রামের মানুষেরাও সাধ্যমতো চাঁদা চাদা দেন। সেই টাকা দিয়ে খালে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মান করা হয় ৩ টি বাধ। বাধগুলো নির্মানের ফলে গ্রামগুলোর কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। খালের আশপাশের প্রায় ৫০০ একর অব্যবহৃত জমিতে এবার দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। গ্রামগুলো জুড়ে কর্মমুখর পরিবেশ। কেউ বসে থাকেন না। নীলগঞ্জ ইউনিয়ন গোটা উপজেলার মধ্যে কৃষির পাশাপাশি সবজি চাষের মডেল ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। একসময়ের দারিদ্র্যক্লিষ্ট গ্রামগুলো এখন অনেকটা সমৃদ্ধিশালী।

নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নীলগঞ্জ ইউনিয়নের গ্রামের সংখ্যা ৫২ টি। এরমধ্যে ঘুটাবাছা, নাওভাঙ্গা,গামুরতলা, পূর্বসোনাতলা, নেয়ামতপুর, এলেমপুর,মজিদপুর, ফরিদগঞ্জ সহ ১৬ টি গ্রামের মধ্য দিয়ে পাখিমারা খাল বয়ে গেছে। পাখিমারার শাখা খাল রয়েছে অন্তত ৭ টি। এরমধ্যে জুগীর খাল, হাজীর খাল, মজিদপুর খাল, আমিরাবাদ খাল, জোনাব আলীর খাল সহ ৭ টি খাল ইউনিয়নের আরো ১০ টি গ্রামে প্রবেশ করেছে।

নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ১০ টি গ্রামের ১০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘পাখিমারা’ খালের দুই প্রান্তে বাধ দেয়া । জুগীর খালের মাধ্যমে পাখিমারা খালে আন্ধারমানিক নদের পানি প্রবাহিত হয়ে আসছে। জুগীর খালের এক প্রান্ত আন্ধারমানিক নদে মিলেছে। আরেক প্রান্ত মিলেছে মাখিমারা খালে। জুগীর খালই তাদের জীবিকার জোগান দেয়। তাই জুগীর খালটি অন্য খালের চেয়ে স্থানীয় কৃষকদের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

কৃষকরা জানান, প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ জুগীর খাল। কুমিরমারা গ্রামে খালটির বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে আটকে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরতেন। ফলে পানি প্রবাহে বিঘœ ঘটতো। দখলদারদের কারণে গ্রামের বাসিন্দারা খালের পানি ব্যবহার করতে পারতেন না। খালের পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা নেই, তাই বর্ষা মৌসুমে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময়গুলো আবাদ হতোনা। সেচের অভাবে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। ফলে সেসময় গ্রামগুলোর অধিকাংশ পুরুষ মানুষ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতেন। দুই যুগের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছিল গ্রামের মানুষগুলোর বেচে থাকার লাড়াই। তবে অসহায় মানুষগুলো স্বপ্ন দেখতেন খাল দখলদার মুক্ত হওয়ার। দিনে দিনে গ্রমাবাসীরা খালের পানি জমিতে সেচ কাজে ব্যবহারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। শুরু হয় খাল দখলমুক্ত করার লড়াই। সেই লড়াইতে গ্রামবাসীর সঙ্গী হন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। প্রায় দুই যুগ পর গ্রামবাসী ও ইউএনও’র সম্মিলিত চেস্টায় প্রভাবশালীদের হাত থেকে দখলমুক্ত হয় জুগীর খাল। খালের পানি ব্যবহারে তখন আর বাধা না থাকলেও দেখা দেয় আরেক সমস্যা ।

কৃষকরা জানান,খালের জলকপাটগুলো (¯øুইস গেট) জরাজীর্ন হওয়ায় জোয়ারের লোনা পানি ঢোকায় তারা আবাদ নিয়ে রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়েন। ওই পানি দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব ছিল না। জলকপাটগুলো মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সহ বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিতে থাকেন তারা। কিন্তু কাজ হয়নি। এবারও তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। খালে বাধ নির্মানে সরকারী তহবিল থেকে ২৫ হাজার টাকা দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। গ্রামের মানুষেরাও সাধ্যমতো চাঁদা চাদা দেন। এভাবে সংগ্রহ হয় ৪০ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে খালে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মান করা হয় ৩ টি বাধ। বাধগুলো নির্মানের ফলে গ্রামগুলোর কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। খালের আশপাশের প্রায় ৫০০ একর অব্যবহৃত জমিতে এবার দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। স্থানীয় কৃষকেরা আবাদ করেছেন তরমুজ, লাউ, শিম, টমেটো, কপি, মুলা,মরিচ সহ নানা ধরনের সবজি। বোরোর আবাদ করেছেন প্রায় ৫০ একর জমিতে। একসময় তাদের শাকসবজি কিনে খেতে হতো। এখন উৎপাদিত সবজি শহরের বাজারে বিক্রি করেন। গ্রামজুড়ে কর্মমুখর পরিবেশ। কেউ বসে থাকেন না। নীলগঞ্জ ইউনিয়ন গোটা উপজেলার মধ্যে কৃষির পাশাপাশি সবজি চাষের মডেল ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জুগীর খাল সহ অন্য খালগুলোর কারণেই বলদে গেছে এসব গ্রামের মানুষের ভাগ্য।

কৃষকরা জানান, খালটি দখলদার মুক্ত করতে ২০০৫ সালে কুমিরমারা গ্রামের প্রবীন কয়েকজন কৃষক উদ্যোগ নেন। তবে দখলদররা প্রভাবশালী হওয়ায় সে যাত্রায় উদ্ধার করা যায়নি খালটি। ২০১৮ সালে কুমিরমারা গ্রামের জাকির গাজী,আবুল কালাম, হেমায়েত গাজী সহ আরো কয়েকজন যুবক খালটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। কুমিরমারা সহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষদের খাল উদ্ধারের উপকারিতা বোঝানো শুরু করেন।

কৃষক জাকির গাজী জানান, খালের পাশেই তার বাবার দুই বিঘা জমি রয়েছে। তবে ওই জমিতে আগে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময়গুলো আবাদ করা যেত না। কারন চাষাবাদ করতে সেচের প্রয়োজন। খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হলেও তা ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটতো। এলাকায় কাজ নেই। তাই কাজ খুজতে শহরে চলে যেতাম।
কৃষক জাকির গাজী জানান, প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে জুগীর খালের অন্তত ৭টি স্থানে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে আটকে দিয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরতেন। এতে পানি প্রবাহে বিঘœ ঘটতো। তিনি আরও বলেন, মজিদপুরের শামসুদ্দিন, ছোটকুমিরমারার মনির হাওলাদার ও কুদ্দুস হাওলাদারের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জন মিলে জুগীর খালে মাছ চাষ করতেন। তাদের ৪০ থেকে ৫০ জনের ক্যাডার বাহিনী ছিল। খালে মাছ চাষে বাধা বা প্রতিবাদ করলে ওই ক্যাডার বাহিনী দিয়ে তার ওপর হামলা চালানো হতো। মামলায় ফাসিয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়া হতো। এসব কারনে গ্রামবাসীরা মুখ খুলতে সাহস পায়নি।

কৃষক জাকির গাজী জানান, ২০১৭ সাল থেকে তিনিসহ এলাকার কয়েকজন গ্রামে ঘুরে লোকজনকে বোঝানো শুরু করেন। দখলদারদের উৎখাতের ব্যাপারে সোচ্চার করেন। কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় সফলতা আসতে থাকে। ২০১৮ সালে গ্রামবাসীদের একাট্টা করে বৈঠক করা হয়। তিনটি গ্রামের শতশত মানুষ ওই বৈঠকে সমবেত হন। সেখানেই খাল উদ্ধারের জন্য গঠন করা হয় নীলগঞ্জ আদর্শ কৃষক শ্রমিক সমবায় সমিতি। সর্বসম্মতিক্রমে গ্রামের প্রবীন সুলতান গাজীকে সভাপতি, আবু বকর মৃধাকে সাধারন সম্পাদক ও তাকে (জাকির গাজী) কোষাধ্যক্ষ করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়।

কৃষক জাকির গাজী জানান, এরপর জুগীর খাল উদ্ধারে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দপ্তরের বারবার ধরনা দিয়েছে সমিতির সদস্যরা। সবাই হবে হবে বলে আশ্বাস দিয়েই বিদায় করেছে। কিন্তু কাজ হয়নি। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এসে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমান স্যারকে বিষয়টি জানাই। তিনি তখন সদ্য যোগ দিয়েছেন। ইউএনও মুনিবুর রহমান স্যার সম্মিলিতভাবে একটি লিখিত আবেদন করতে বলেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খাল উদ্ধারের উদ্যোগ নেন ইউএনও স্যারকে। তিনি প্রতিশ্রæতি দিয়েই থেমে যাননি।

কৃষক জাকির গাজী জানান, ইউএনও স্যার ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে নিজে গ্রামে এসে খাল থেকে দখলদারদের জাল অপসারনে অভিযান চালান। পুড়িয়ে ফেলা হয় জাল। কিন্তু দখলদাররা কয়েকদিন পর আবার খালে জাল পেতে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃস্টি করে। এরপর ইউএনও স্যারের উদ্যোগে আরো দুই দফায় অভিযান চালানো হয়। সর্বশেষ অভিযানে দখলদারদের কঠোরভাব হুশিয়ারি দেন ইউএনও স্যার। এরপর দখলদাররা আর জাল পাতার সাহস পায়নি।

জাকির গাজী বলেন, আগে খালের পানি ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। সেচের অভাবে বিঘার পর বিঘা জমি অনাবাদি থাকতো। ৭ মাস আগেও কাজের জন্য গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ শহরে চলে যেতেন। এখন তারা গ্রামেই কৃষি কাজ করছেন। তাদের মুখে হাসি ফুটেছে।

জাকির গাজী বলেন, তার বাবার দুই বিঘা জমি রয়েছে। তবে সেচের অভাবে বছরের ৮ মাস ওই জমি অনাবাদি থাকতো। এবার অবস্থা পাল্টেছে। তার ২ বিঘার সঙ্গে আরো ৫ বিঘা বর্গা নিয়ে লাউ, শিম, মিস্টিকুমরা, লাল শাক, মরিচ সহ বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করেছেন। সার, কীটনাশক, বীজ, শ্রমিকের মজুরিসহ চাষ বাবদ তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সবজি বিক্রি করে পেয়েছেন তিনি ২ লাখ টাকা। লাউ, শিম ও মরিচ থেকে আরও প্রায় ১ লাখ টাকা পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।

কুমিরমারা গ্রামের শিক্ষিত যুবক হেমায়েত উদ্দিন (২৪)। হেমায়েত এবার মাস্টার্স পরীক্ষার্থী। চাকরির চিন্তা না করে তিনি সোজা নেমে পড়েছেন কৃষিকাজে। বাবার দেওয়া জমিতে শুরু করেন বিভিন্ন সবজি ও ফসলের আবাদ। এছাড়াও এবার আরো ১০ শতাংশ জমি বন্ধক নিয়ে বোম্বাই মরিচের আবাদ করেছেন। চাষ বাবদ তার খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বোম্বাই মরিচ থেকে ২ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

হেমায়েত উদ্দিন বলেন, বিএ পাস করার পর চাকরি করার চিন্তা ছিল। তখন জমিতে সেচের অভাবে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যেত না। এবার অবস্থা পাল্টেছে। কৃষকেরা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। তবে গ্রামের কৃষকরা একসময় হতাশায় ভুগছিলেন। তখন অলৌকিকভাবে পাশে এসে দাঁড়ালেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমান। তার কাছে আমাদের ঋণের কোনো শেষ নেই, নেই কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা।

মজিদপুর গ্রামের লিটন হওলাদার জানান, একসময় তিনি ঢাকা ও বরিশালে গিয়ে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন । তবে এখন অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। সবজি চাষাবাদ করে তার অভাব দূর হয়েছে।

নীলগঞ্জ আদর্শ কৃষক শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি সুলতান গাজী জানান, জমিতে সেচ দেয়ার জন্য আগে খালের পানি ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। ফসলাদি ভালো হতো না বলে কুমিরমারা গ্রামে অভাব লেগেই ছিল। এক ফসলি জমি ছিল গ্রামবাসীর একমাত্র ভরসা। এখন কুমিরমারা সহ আশেপাশের আরো কয়েকটি গ্রামটির চিত্র বদলে গেছে। কৃষকেরা এখন সবজির আবাদ করছেন। খেতগুলো শিম, টমেটো, বাধা কপি, ফুলকপি সহ শাকসবজিতে ভরে উঠেছে। এই সবজিই গ্রামটির অভাব দূর করেছে। অন্যদিকে নীলগঞ্জ আদর্শ কৃষক শ্রমিক সমবায় সমিতির সাফল্য দেখে আশেপাশের কৃষকেরা সদস্য হচ্ছেন। সমিতির সদস্য সংখ্যা ৩৪ থেকে এখন বেড়ে দাড়িয়েছে ২৩৯ জনে।

সুলতান গাজী বলেন, খালের জলকপাটগুলো (¯øুইস গেট) জরাজীর্ন ছিল। জোয়ারের সময় লোনা পানি প্রবেশ করতো। সেই সমস্যা নিরসনে খালে বাধ দেয়া হয়েছে। খালে বাধ নির্মানে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন ইউএনও স্যার। বাধের কারনে এখন নোনা পানি ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি খালগুলোতে মিঠা পানি সংরক্ষন করা গেছে। শুকনো মৌসুমে এসেও ওই পানি জমিতে সেচ দেয়ার জন্য ব্যবহার করা যাচ্ছে। ইউএনও স্যারের সহযোগিতা ছাড়া এসব সম্ভব ছিল না। তার এই ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না।

খাল দখলের ব্যাপারে মজিদপুর গ্রামের শামসুদ্দিন বলেন, অনেক আগে ইজারা নিয়ে খালে মাছ চাষ করতাম। পরে আর ইজারা দেয়া হয়নি। মাছ চাষও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দলের (ছাত্রলীগ) কয়েকজন ছেলে খালে বেনতি জাল পেতে রেখে মাছ ধরতো। এতে কৃষিকাজের কোনো ক্ষতি হতো না। তবে এ কাজটা আমার নেতৃত্বে হয়েছে, এটা ঠিক নয়। এর সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জন যুবক জড়িত ছিল। অভিযানের পর এখন খালে জাল পেতে রেখে তাদের কেউ আর মাছ শিকার করে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মন্নান জানান, সেচের সুবিধা পেয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের অন্তত ২৬ টি গ্রামের ৫ শতাধিক একর জমিতে নতুন করে এবার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ একর জমিতে বোরোর চাষ হয়েছে। বাকি জমিতে কৃষকেরা সবজির চাষ করছেন। সবজি আবাদ করে কৃষকেরা ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। আগে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করে বছরে ১৪ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় হতো। এবার সবজি চাষ করে গড়ে প্রতি বিঘা থেকে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হবে। সবজির আবাদ এখানকার কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এতে তাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে গ্রামগুলোর কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও রোগবালাই দমনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন মাহমুদ জানান, সেচ সুবিধা পেয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ২৫ থেকে ৩০ গ্রামের মানুষ কৃষিতে যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। পরিবর্তন এসেছে তাদের জীবনযাত্রায়। জমি আবাদ করে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করেছেন। আগে জমিগুলো পড়ে থাকত। এখন তারা আবাদ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। সবচেয়ে ভালো খবর হলো লেখাপড়া ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলেমেয়েরা।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমান জানান, প্রশাসনের কাজ হচ্ছে জনসেবা করা। আমি শুধু আমার ওপর রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি। গ্রামবাসীরাই সম্মিলিত প্রচেস্টায় চরম প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন। রীতিমতো সংগ্রাম করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তারাই করে নিয়েছেন। সহায়তা পেলে গ্রামের মানুষ তার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে, নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ইউএনও’র ছোঁয়ায় পাল্টে গেল ২৬ গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ.।

আপডেট সময় : ০৬:০৮:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২০

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ১৬ টি গ্রামের মধ্য দিয়ে একে বেকে বয়ে গেছে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘পাখিমার’ খাল। এই খাল থেকে অন্তত ৭ টি শাখা ইউনিয়নের আরো ১০টি গ্রামে প্রবেশ করেছে। ৫০-৬০ বছর আগে বন্যা ও জলোচ্ছাস থেকে রক্ষা পেতে ‘পাখিমারা’ খালের দুই প্রান্তে বাধ দেয়া হয়। এরপর থেকে শাখা জুগীর খালের মাধ্যমে পাখিমারা খালে আন্ধারমানিক নদের পানি প্রবাহিত হয়ে আসছে। জুগীর খালের এক প্রান্ত আন্ধারমানিক নদে মিলেছে। আরেক প্রান্ত মিলেছে মাখিমারা খালে। খালগুলো মিঠা পানির অন্যতম উৎস। অন্তত ২৬টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ তাদের জীবিকার জন্য এই খালগুলোর ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাদের

তবে কুমিরমারা গ্রামে জুগীর খালের বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরতেন। ফলে পানি প্রবাহে বিঘœ ঘটতো। দখলদারদের কারণে গ্রামের বাসিন্দারা খালের পানি ব্যবহার করতে পারতেন না। খালের পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা নেই, তাই বর্ষা মৌসুমে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময়গুলো আবাদ হতোনা। সেচের অভাবে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। ফলে সেসময় গ্রামগুলোর অধিকাংশ পুরুষ মানুষ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতেন। দুই যুগের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছিল গ্রামের মানুষগুলোর বেচে থাকার লাড়াই।

অবশেষে প্রায় দুই যুগ পর কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমানের হস্তক্ষেপে দখল মুক্ত হয় খাল। তখন খালের পানি ব্যবহারে আর বাধা না থাকলেও দেখা দেয় আরেক সমস্যা। খালের জলকপাটগুলো (¯øুইস গেট) জরাজীর্ন হওয়ায় জোয়ারের লোনা পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হয় খালের দুই পাশের কৃষি জমি। এর ওপর লোনা পানি দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব ছিল না। এবারও তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেন উপজেলা ইউএনও। খালে বাধ নির্মানে সরকারী তহবিল থেকে টাকাও দেন তিনি। গ্রামের মানুষেরাও সাধ্যমতো চাঁদা চাদা দেন। সেই টাকা দিয়ে খালে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মান করা হয় ৩ টি বাধ। বাধগুলো নির্মানের ফলে গ্রামগুলোর কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। খালের আশপাশের প্রায় ৫০০ একর অব্যবহৃত জমিতে এবার দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। গ্রামগুলো জুড়ে কর্মমুখর পরিবেশ। কেউ বসে থাকেন না। নীলগঞ্জ ইউনিয়ন গোটা উপজেলার মধ্যে কৃষির পাশাপাশি সবজি চাষের মডেল ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। একসময়ের দারিদ্র্যক্লিষ্ট গ্রামগুলো এখন অনেকটা সমৃদ্ধিশালী।

নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নীলগঞ্জ ইউনিয়নের গ্রামের সংখ্যা ৫২ টি। এরমধ্যে ঘুটাবাছা, নাওভাঙ্গা,গামুরতলা, পূর্বসোনাতলা, নেয়ামতপুর, এলেমপুর,মজিদপুর, ফরিদগঞ্জ সহ ১৬ টি গ্রামের মধ্য দিয়ে পাখিমারা খাল বয়ে গেছে। পাখিমারার শাখা খাল রয়েছে অন্তত ৭ টি। এরমধ্যে জুগীর খাল, হাজীর খাল, মজিদপুর খাল, আমিরাবাদ খাল, জোনাব আলীর খাল সহ ৭ টি খাল ইউনিয়নের আরো ১০ টি গ্রামে প্রবেশ করেছে।

নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ১০ টি গ্রামের ১০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘পাখিমারা’ খালের দুই প্রান্তে বাধ দেয়া । জুগীর খালের মাধ্যমে পাখিমারা খালে আন্ধারমানিক নদের পানি প্রবাহিত হয়ে আসছে। জুগীর খালের এক প্রান্ত আন্ধারমানিক নদে মিলেছে। আরেক প্রান্ত মিলেছে মাখিমারা খালে। জুগীর খালই তাদের জীবিকার জোগান দেয়। তাই জুগীর খালটি অন্য খালের চেয়ে স্থানীয় কৃষকদের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

কৃষকরা জানান, প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ জুগীর খাল। কুমিরমারা গ্রামে খালটির বিভিন্ন অংশে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে আটকে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরতেন। ফলে পানি প্রবাহে বিঘœ ঘটতো। দখলদারদের কারণে গ্রামের বাসিন্দারা খালের পানি ব্যবহার করতে পারতেন না। খালের পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা নেই, তাই বর্ষা মৌসুমে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময়গুলো আবাদ হতোনা। সেচের অভাবে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো। ফলে সেসময় গ্রামগুলোর অধিকাংশ পুরুষ মানুষ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতেন। দুই যুগের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছিল গ্রামের মানুষগুলোর বেচে থাকার লাড়াই। তবে অসহায় মানুষগুলো স্বপ্ন দেখতেন খাল দখলদার মুক্ত হওয়ার। দিনে দিনে গ্রমাবাসীরা খালের পানি জমিতে সেচ কাজে ব্যবহারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। শুরু হয় খাল দখলমুক্ত করার লড়াই। সেই লড়াইতে গ্রামবাসীর সঙ্গী হন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। প্রায় দুই যুগ পর গ্রামবাসী ও ইউএনও’র সম্মিলিত চেস্টায় প্রভাবশালীদের হাত থেকে দখলমুক্ত হয় জুগীর খাল। খালের পানি ব্যবহারে তখন আর বাধা না থাকলেও দেখা দেয় আরেক সমস্যা ।

কৃষকরা জানান,খালের জলকপাটগুলো (¯øুইস গেট) জরাজীর্ন হওয়ায় জোয়ারের লোনা পানি ঢোকায় তারা আবাদ নিয়ে রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়েন। ওই পানি দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব ছিল না। জলকপাটগুলো মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সহ বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিতে থাকেন তারা। কিন্তু কাজ হয়নি। এবারও তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। খালে বাধ নির্মানে সরকারী তহবিল থেকে ২৫ হাজার টাকা দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। গ্রামের মানুষেরাও সাধ্যমতো চাঁদা চাদা দেন। এভাবে সংগ্রহ হয় ৪০ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে খালে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে নির্মান করা হয় ৩ টি বাধ। বাধগুলো নির্মানের ফলে গ্রামগুলোর কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। খালের আশপাশের প্রায় ৫০০ একর অব্যবহৃত জমিতে এবার দেখা যাচ্ছে সবুজের সমারোহ। স্থানীয় কৃষকেরা আবাদ করেছেন তরমুজ, লাউ, শিম, টমেটো, কপি, মুলা,মরিচ সহ নানা ধরনের সবজি। বোরোর আবাদ করেছেন প্রায় ৫০ একর জমিতে। একসময় তাদের শাকসবজি কিনে খেতে হতো। এখন উৎপাদিত সবজি শহরের বাজারে বিক্রি করেন। গ্রামজুড়ে কর্মমুখর পরিবেশ। কেউ বসে থাকেন না। নীলগঞ্জ ইউনিয়ন গোটা উপজেলার মধ্যে কৃষির পাশাপাশি সবজি চাষের মডেল ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জুগীর খাল সহ অন্য খালগুলোর কারণেই বলদে গেছে এসব গ্রামের মানুষের ভাগ্য।

কৃষকরা জানান, খালটি দখলদার মুক্ত করতে ২০০৫ সালে কুমিরমারা গ্রামের প্রবীন কয়েকজন কৃষক উদ্যোগ নেন। তবে দখলদররা প্রভাবশালী হওয়ায় সে যাত্রায় উদ্ধার করা যায়নি খালটি। ২০১৮ সালে কুমিরমারা গ্রামের জাকির গাজী,আবুল কালাম, হেমায়েত গাজী সহ আরো কয়েকজন যুবক খালটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। কুমিরমারা সহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষদের খাল উদ্ধারের উপকারিতা বোঝানো শুরু করেন।

কৃষক জাকির গাজী জানান, খালের পাশেই তার বাবার দুই বিঘা জমি রয়েছে। তবে ওই জমিতে আগে আমন ছাড়া বছরের অন্য সময়গুলো আবাদ করা যেত না। কারন চাষাবাদ করতে সেচের প্রয়োজন। খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হলেও তা ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটতো। এলাকায় কাজ নেই। তাই কাজ খুজতে শহরে চলে যেতাম।
কৃষক জাকির গাজী জানান, প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে জুগীর খালের অন্তত ৭টি স্থানে আড়াআড়ি করে বাঁশের ওপর জাল দিয়ে আটকে দিয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবার মাছ ধরতেন। এতে পানি প্রবাহে বিঘœ ঘটতো। তিনি আরও বলেন, মজিদপুরের শামসুদ্দিন, ছোটকুমিরমারার মনির হাওলাদার ও কুদ্দুস হাওলাদারের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জন মিলে জুগীর খালে মাছ চাষ করতেন। তাদের ৪০ থেকে ৫০ জনের ক্যাডার বাহিনী ছিল। খালে মাছ চাষে বাধা বা প্রতিবাদ করলে ওই ক্যাডার বাহিনী দিয়ে তার ওপর হামলা চালানো হতো। মামলায় ফাসিয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়া হতো। এসব কারনে গ্রামবাসীরা মুখ খুলতে সাহস পায়নি।

কৃষক জাকির গাজী জানান, ২০১৭ সাল থেকে তিনিসহ এলাকার কয়েকজন গ্রামে ঘুরে লোকজনকে বোঝানো শুরু করেন। দখলদারদের উৎখাতের ব্যাপারে সোচ্চার করেন। কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় সফলতা আসতে থাকে। ২০১৮ সালে গ্রামবাসীদের একাট্টা করে বৈঠক করা হয়। তিনটি গ্রামের শতশত মানুষ ওই বৈঠকে সমবেত হন। সেখানেই খাল উদ্ধারের জন্য গঠন করা হয় নীলগঞ্জ আদর্শ কৃষক শ্রমিক সমবায় সমিতি। সর্বসম্মতিক্রমে গ্রামের প্রবীন সুলতান গাজীকে সভাপতি, আবু বকর মৃধাকে সাধারন সম্পাদক ও তাকে (জাকির গাজী) কোষাধ্যক্ষ করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়।

কৃষক জাকির গাজী জানান, এরপর জুগীর খাল উদ্ধারে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দপ্তরের বারবার ধরনা দিয়েছে সমিতির সদস্যরা। সবাই হবে হবে বলে আশ্বাস দিয়েই বিদায় করেছে। কিন্তু কাজ হয়নি। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এসে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমান স্যারকে বিষয়টি জানাই। তিনি তখন সদ্য যোগ দিয়েছেন। ইউএনও মুনিবুর রহমান স্যার সম্মিলিতভাবে একটি লিখিত আবেদন করতে বলেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খাল উদ্ধারের উদ্যোগ নেন ইউএনও স্যারকে। তিনি প্রতিশ্রæতি দিয়েই থেমে যাননি।

কৃষক জাকির গাজী জানান, ইউএনও স্যার ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে নিজে গ্রামে এসে খাল থেকে দখলদারদের জাল অপসারনে অভিযান চালান। পুড়িয়ে ফেলা হয় জাল। কিন্তু দখলদাররা কয়েকদিন পর আবার খালে জাল পেতে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃস্টি করে। এরপর ইউএনও স্যারের উদ্যোগে আরো দুই দফায় অভিযান চালানো হয়। সর্বশেষ অভিযানে দখলদারদের কঠোরভাব হুশিয়ারি দেন ইউএনও স্যার। এরপর দখলদাররা আর জাল পাতার সাহস পায়নি।

জাকির গাজী বলেন, আগে খালের পানি ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। সেচের অভাবে বিঘার পর বিঘা জমি অনাবাদি থাকতো। ৭ মাস আগেও কাজের জন্য গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ শহরে চলে যেতেন। এখন তারা গ্রামেই কৃষি কাজ করছেন। তাদের মুখে হাসি ফুটেছে।

জাকির গাজী বলেন, তার বাবার দুই বিঘা জমি রয়েছে। তবে সেচের অভাবে বছরের ৮ মাস ওই জমি অনাবাদি থাকতো। এবার অবস্থা পাল্টেছে। তার ২ বিঘার সঙ্গে আরো ৫ বিঘা বর্গা নিয়ে লাউ, শিম, মিস্টিকুমরা, লাল শাক, মরিচ সহ বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করেছেন। সার, কীটনাশক, বীজ, শ্রমিকের মজুরিসহ চাষ বাবদ তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সবজি বিক্রি করে পেয়েছেন তিনি ২ লাখ টাকা। লাউ, শিম ও মরিচ থেকে আরও প্রায় ১ লাখ টাকা পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।

কুমিরমারা গ্রামের শিক্ষিত যুবক হেমায়েত উদ্দিন (২৪)। হেমায়েত এবার মাস্টার্স পরীক্ষার্থী। চাকরির চিন্তা না করে তিনি সোজা নেমে পড়েছেন কৃষিকাজে। বাবার দেওয়া জমিতে শুরু করেন বিভিন্ন সবজি ও ফসলের আবাদ। এছাড়াও এবার আরো ১০ শতাংশ জমি বন্ধক নিয়ে বোম্বাই মরিচের আবাদ করেছেন। চাষ বাবদ তার খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বোম্বাই মরিচ থেকে ২ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

হেমায়েত উদ্দিন বলেন, বিএ পাস করার পর চাকরি করার চিন্তা ছিল। তখন জমিতে সেচের অভাবে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যেত না। এবার অবস্থা পাল্টেছে। কৃষকেরা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। তবে গ্রামের কৃষকরা একসময় হতাশায় ভুগছিলেন। তখন অলৌকিকভাবে পাশে এসে দাঁড়ালেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমান। তার কাছে আমাদের ঋণের কোনো শেষ নেই, নেই কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা।

মজিদপুর গ্রামের লিটন হওলাদার জানান, একসময় তিনি ঢাকা ও বরিশালে গিয়ে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন । তবে এখন অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। সবজি চাষাবাদ করে তার অভাব দূর হয়েছে।

নীলগঞ্জ আদর্শ কৃষক শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি সুলতান গাজী জানান, জমিতে সেচ দেয়ার জন্য আগে খালের পানি ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। ফসলাদি ভালো হতো না বলে কুমিরমারা গ্রামে অভাব লেগেই ছিল। এক ফসলি জমি ছিল গ্রামবাসীর একমাত্র ভরসা। এখন কুমিরমারা সহ আশেপাশের আরো কয়েকটি গ্রামটির চিত্র বদলে গেছে। কৃষকেরা এখন সবজির আবাদ করছেন। খেতগুলো শিম, টমেটো, বাধা কপি, ফুলকপি সহ শাকসবজিতে ভরে উঠেছে। এই সবজিই গ্রামটির অভাব দূর করেছে। অন্যদিকে নীলগঞ্জ আদর্শ কৃষক শ্রমিক সমবায় সমিতির সাফল্য দেখে আশেপাশের কৃষকেরা সদস্য হচ্ছেন। সমিতির সদস্য সংখ্যা ৩৪ থেকে এখন বেড়ে দাড়িয়েছে ২৩৯ জনে।

সুলতান গাজী বলেন, খালের জলকপাটগুলো (¯øুইস গেট) জরাজীর্ন ছিল। জোয়ারের সময় লোনা পানি প্রবেশ করতো। সেই সমস্যা নিরসনে খালে বাধ দেয়া হয়েছে। খালে বাধ নির্মানে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন ইউএনও স্যার। বাধের কারনে এখন নোনা পানি ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি খালগুলোতে মিঠা পানি সংরক্ষন করা গেছে। শুকনো মৌসুমে এসেও ওই পানি জমিতে সেচ দেয়ার জন্য ব্যবহার করা যাচ্ছে। ইউএনও স্যারের সহযোগিতা ছাড়া এসব সম্ভব ছিল না। তার এই ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না।

খাল দখলের ব্যাপারে মজিদপুর গ্রামের শামসুদ্দিন বলেন, অনেক আগে ইজারা নিয়ে খালে মাছ চাষ করতাম। পরে আর ইজারা দেয়া হয়নি। মাছ চাষও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দলের (ছাত্রলীগ) কয়েকজন ছেলে খালে বেনতি জাল পেতে রেখে মাছ ধরতো। এতে কৃষিকাজের কোনো ক্ষতি হতো না। তবে এ কাজটা আমার নেতৃত্বে হয়েছে, এটা ঠিক নয়। এর সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জন যুবক জড়িত ছিল। অভিযানের পর এখন খালে জাল পেতে রেখে তাদের কেউ আর মাছ শিকার করে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মন্নান জানান, সেচের সুবিধা পেয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের অন্তত ২৬ টি গ্রামের ৫ শতাধিক একর জমিতে নতুন করে এবার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ একর জমিতে বোরোর চাষ হয়েছে। বাকি জমিতে কৃষকেরা সবজির চাষ করছেন। সবজি আবাদ করে কৃষকেরা ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। আগে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করে বছরে ১৪ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় হতো। এবার সবজি চাষ করে গড়ে প্রতি বিঘা থেকে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হবে। সবজির আবাদ এখানকার কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এতে তাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে গ্রামগুলোর কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও রোগবালাই দমনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন মাহমুদ জানান, সেচ সুবিধা পেয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ২৫ থেকে ৩০ গ্রামের মানুষ কৃষিতে যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। পরিবর্তন এসেছে তাদের জীবনযাত্রায়। জমি আবাদ করে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করেছেন। আগে জমিগুলো পড়ে থাকত। এখন তারা আবাদ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। সবচেয়ে ভালো খবর হলো লেখাপড়া ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে ছেলেমেয়েরা।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুনিবুর রহমান জানান, প্রশাসনের কাজ হচ্ছে জনসেবা করা। আমি শুধু আমার ওপর রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি। গ্রামবাসীরাই সম্মিলিত প্রচেস্টায় চরম প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন। রীতিমতো সংগ্রাম করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তারাই করে নিয়েছেন। সহায়তা পেলে গ্রামের মানুষ তার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে, নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।