সংবাদ শিরোনাম ::
আগৈলঝাড়ায় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে দোকান দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ, থানায় দুই অভিযোগ ঝালকাঠিতে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের নদীভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম ও “ধানসিঁড়ি সাংস্কৃতিক পল্লী” নলছিটিতে ১৭ পিস ইয়াবাসহ যুবক গ্রেপ্তার চুয়াডাঙ্গায় জাতীয় নাগরিক পার্টির জুলাই পদযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচিত বিজয়নগর থানার, আহসান উল্লাহ, রাজাপুরে মাদকের আখড়ায় অভিযান: ইয়াবাসহ আটক ২, বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ঝালকাঠিতে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স খাদ্যে পড়ে আহত ১, পা ভাঙল রোগীর দামুড়হুদার মদনায় বিস্কুট ফ্যাক্টারিতে আগুন ক্ষতি প্রায় ৮ লক্ষাধিক ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল বৈরী আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও অবৈধ জালে সংকটে সুন্দরবন উপকূলের মৎস্য অর্থনীতি সাগরে নেই ট্রলার, আড়তে নেই মাছ বানারীপাড়ায় বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম রকি তেতলা পিজিএস স্কুলের সভাপতি

বঙ্গবন্ধুর চোখে শামসুল হক

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:২০:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪ ১৬ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সোহেল সানি

১৯৪৩ সাল থেকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠানকে জমিদার, নবাবদের দালানের কোঠা থেকে বের করে জনগণের পর্ণকুটিরে যারা নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে শামসুল হক সাহেব ছিলেন অন্যতম। একেই বলে কপাল, কারণ সেই পাকিস্তানের জেলেই শামসুল হক সাহেবকে পাগল হতে হলো। পাকিস্তান আন্দোলনে তাঁর অবদান যারা এখন ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি।

উপর্যুক্ত কথাগুলো, শেখ মুজিবুর রহমানের, যিনি শামসুল হকের কারাবন্দি থাকা অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

যদিও উদার শেখ মুজিব শামসুল হক কারামুক্ত হলে তাঁকেই সাধারণ সম্পাদকের পদে দায়িত্ব পালনে অনুরোধ করেছিলেন।
শেখ মুজিব তাঁর আত্মজীবনীতে শামসুল হক সম্পর্কে লিখেছেন,

একজন নিঃস্বার্থ দেশকর্মী, ত্যাগী নেতা আজ দেশের কাজ করতে যেয়ে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে থেকে পাগল হয়ে বের হলেন। এ দুঃখের কথা কোথায় বলা যাবে?

আমি অনেকের সাথে পরামর্শ করে তাঁর চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। উল্টা আমার উপর ক্ষেপে গেলেন।

আমি তাঁকে প্রতিষ্ঠানের জেনারেল সেক্রেটারির (সাধারণ সম্পাদক) ভার নিতে অনুরোধ করলাম। কার্যকরী কমিটির সভা ডেকে তাঁকে অনুরোধ করলাম, কারণ এতদিন আমি অ্যাকটিং জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছিলাম। ভাবলাম, কাজের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লে তিনি ভালো হয়ে যেতে পারেন। তিনি সভায় উপস্থিত হলেন এবং বললেন, ‘‘আমি প্রতিষ্ঠানের জেনারেল সেক্রেটারির ভার নিতে পারবো না, মুজিব কাজ চালিয়ে যাক।
’ আজেবাজে কথাও বললেন, যাতে সকলেই বুঝতে পারলেন যে, তাঁর মাথায় কিছুটা গোলমাল হয়েছে। ”
এরপরই ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান এ বিষয়ে লিখেছেন, .. “হক সাহেবকে সভাপতিত্ব করার জন্য জোর করেই উপস্থিত করলাম। তিনি এমন এক বক্তৃতা করলেন যাতে সকলেই দুঃখ পেলাম। কারণ তিনি নিজেকে সমস্ত দুনিয়ার খলিফা বলে ঘোষণা করলেন।

আমরা হতাশ হয়ে পড়লাম, কি করে তাঁর চিকিৎসা করানো যাবে? আরও অসুবিধার পড়লাম, হক সাহেবের স্ত্রী প্রফেসর আফিয়া খাতুন বিদেশে লেখাপড়া করতে যাওয়ায়। তিনি থাকলে হয়ত কিছুটা ব্যবস্থা করা যেতো। ”
শামসুল হক ১৯১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মাইঠান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি হঠাৎ করেই নিখোঁজ হন এবং ১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ইন্তেকাল করেন। শামসুল হক গবেষণা পরিষদ অনেক খুঁজে মৃত্যুর ৪২ বছর পর ২০০৭ সালে টাঙ্গাইলে কালিহাতী উপজেলার কদিম হামজানিতে মরহুমের কবর আবিষ্কার করেন।

শামসুল হক বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিমপন্থি রূপে পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৫ সালে নভেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থীরা প্রায় সবাই জয়লাভ করেন। ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে মুসলিম লীগ শতকরা ৯৭ ভাগ আসনেই জয়লাভ করে। ওই সময় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কর্মিশিবিরের নেতৃত্বে ছিলেন শামসুল হক।

এসব বিবেচনায় পাকিস্তান সৃষ্টিতে শামসুল হকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অনস্বীকার্য। এ ছাড়া সিলেটকে পাকিস্তানভুক্ত করার গণভোটে তার অবদান ছিল অপরিসীম।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্ররা সারা প্রদেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেন। সেদিন সচিবালয়, নীলক্ষেত ও হাই কোর্টের সামনে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ ঘটে। বহু ছাত্র আহত এবং গ্রেফতার হন। যেসব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি সেদিন গ্রেফতার হন তাদের মাঝে শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অন্যতম। শেখ মুজিব পরিচিত ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য রূপে।

যাহোক ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে টাঙ্গাইলের দক্ষিণ মুসলিম কেন্দ্রে দেশবিভাগ পূর্ব আসাম মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন। এরপর উপনির্বাচনে শামসুল হক প্রার্থী হন। তিনি ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রার্থী করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার খুররম খান পন্নীকে হারিয়ে এমএলএ নির্বাচিত হন। কিন্তু তাঁর বিজয় কেড়ে নেওয়া হয় নির্বাচনি মামলা দিয়ে। এর আগে যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিল্লি কনভেনশনে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ করেন, সেই তাঁর গণপরিষদের সদস্য পদও কেড়ে নেওয়া হয়।

খোদ গণপরিষদ নেতা প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে সোহরাওয়ার্দীকে বলেন, ‘ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর। ’

মুসলিম লীগের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে সোহরাওয়ার্দী ভাসানীসহ সবার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত দেন গণমানুষের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগের কর্মী সম্মেলন। যে সম্মেলনে গঠিত হয় পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসছেন, এমন খবরে আওয়ামী মুসলিম লীগ একটা শোভাযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ওই সময় দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক একটু ব্যস্ত ছিলেন, তাঁর বিবাহের দিন ঘনিয়ে আসছিল। যে কারণে দলের সমস্ত কাজ যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকেই করতে হতো। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ‘‘তিনি (শামসুল হক) আমাকে বললেন, প্রতিষ্ঠানের কাজ তুমি চালিয়ে যাও। আমাদের মধ্যে এতো মিল ছিলো যে কোন ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাই ছিলো না। আমি বুঝতে পারতাম মওলানা (সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী) সাহেব, হক সাহেবকে অপছন্দ করতে শুরু করেছেন। সুযোগ পেলেই তাঁর বিরুদ্ধে বলতেন। আমি চেষ্টা করতাম, যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয়। ”

লেখক : সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

বঙ্গবন্ধুর চোখে শামসুল হক

আপডেট সময় : ০৭:২০:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪

সোহেল সানি

১৯৪৩ সাল থেকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠানকে জমিদার, নবাবদের দালানের কোঠা থেকে বের করে জনগণের পর্ণকুটিরে যারা নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে শামসুল হক সাহেব ছিলেন অন্যতম। একেই বলে কপাল, কারণ সেই পাকিস্তানের জেলেই শামসুল হক সাহেবকে পাগল হতে হলো। পাকিস্তান আন্দোলনে তাঁর অবদান যারা এখন ক্ষমতায় আছেন, তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি।

উপর্যুক্ত কথাগুলো, শেখ মুজিবুর রহমানের, যিনি শামসুল হকের কারাবন্দি থাকা অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

যদিও উদার শেখ মুজিব শামসুল হক কারামুক্ত হলে তাঁকেই সাধারণ সম্পাদকের পদে দায়িত্ব পালনে অনুরোধ করেছিলেন।
শেখ মুজিব তাঁর আত্মজীবনীতে শামসুল হক সম্পর্কে লিখেছেন,

একজন নিঃস্বার্থ দেশকর্মী, ত্যাগী নেতা আজ দেশের কাজ করতে যেয়ে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে থেকে পাগল হয়ে বের হলেন। এ দুঃখের কথা কোথায় বলা যাবে?

আমি অনেকের সাথে পরামর্শ করে তাঁর চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। উল্টা আমার উপর ক্ষেপে গেলেন।

আমি তাঁকে প্রতিষ্ঠানের জেনারেল সেক্রেটারির (সাধারণ সম্পাদক) ভার নিতে অনুরোধ করলাম। কার্যকরী কমিটির সভা ডেকে তাঁকে অনুরোধ করলাম, কারণ এতদিন আমি অ্যাকটিং জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছিলাম। ভাবলাম, কাজের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লে তিনি ভালো হয়ে যেতে পারেন। তিনি সভায় উপস্থিত হলেন এবং বললেন, ‘‘আমি প্রতিষ্ঠানের জেনারেল সেক্রেটারির ভার নিতে পারবো না, মুজিব কাজ চালিয়ে যাক।
’ আজেবাজে কথাও বললেন, যাতে সকলেই বুঝতে পারলেন যে, তাঁর মাথায় কিছুটা গোলমাল হয়েছে। ”
এরপরই ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান এ বিষয়ে লিখেছেন, .. “হক সাহেবকে সভাপতিত্ব করার জন্য জোর করেই উপস্থিত করলাম। তিনি এমন এক বক্তৃতা করলেন যাতে সকলেই দুঃখ পেলাম। কারণ তিনি নিজেকে সমস্ত দুনিয়ার খলিফা বলে ঘোষণা করলেন।

আমরা হতাশ হয়ে পড়লাম, কি করে তাঁর চিকিৎসা করানো যাবে? আরও অসুবিধার পড়লাম, হক সাহেবের স্ত্রী প্রফেসর আফিয়া খাতুন বিদেশে লেখাপড়া করতে যাওয়ায়। তিনি থাকলে হয়ত কিছুটা ব্যবস্থা করা যেতো। ”
শামসুল হক ১৯১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মাইঠান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি হঠাৎ করেই নিখোঁজ হন এবং ১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ইন্তেকাল করেন। শামসুল হক গবেষণা পরিষদ অনেক খুঁজে মৃত্যুর ৪২ বছর পর ২০০৭ সালে টাঙ্গাইলে কালিহাতী উপজেলার কদিম হামজানিতে মরহুমের কবর আবিষ্কার করেন।

শামসুল হক বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিমপন্থি রূপে পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৫ সালে নভেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থীরা প্রায় সবাই জয়লাভ করেন। ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে মুসলিম লীগ শতকরা ৯৭ ভাগ আসনেই জয়লাভ করে। ওই সময় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কর্মিশিবিরের নেতৃত্বে ছিলেন শামসুল হক।

এসব বিবেচনায় পাকিস্তান সৃষ্টিতে শামসুল হকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অনস্বীকার্য। এ ছাড়া সিলেটকে পাকিস্তানভুক্ত করার গণভোটে তার অবদান ছিল অপরিসীম।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্ররা সারা প্রদেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেন। সেদিন সচিবালয়, নীলক্ষেত ও হাই কোর্টের সামনে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ ঘটে। বহু ছাত্র আহত এবং গ্রেফতার হন। যেসব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি সেদিন গ্রেফতার হন তাদের মাঝে শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অন্যতম। শেখ মুজিব পরিচিত ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য রূপে।

যাহোক ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে টাঙ্গাইলের দক্ষিণ মুসলিম কেন্দ্রে দেশবিভাগ পূর্ব আসাম মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন। এরপর উপনির্বাচনে শামসুল হক প্রার্থী হন। তিনি ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রার্থী করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার খুররম খান পন্নীকে হারিয়ে এমএলএ নির্বাচিত হন। কিন্তু তাঁর বিজয় কেড়ে নেওয়া হয় নির্বাচনি মামলা দিয়ে। এর আগে যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিল্লি কনভেনশনে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ করেন, সেই তাঁর গণপরিষদের সদস্য পদও কেড়ে নেওয়া হয়।

খোদ গণপরিষদ নেতা প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে সোহরাওয়ার্দীকে বলেন, ‘ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর। ’

মুসলিম লীগের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে সোহরাওয়ার্দী ভাসানীসহ সবার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত দেন গণমানুষের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগের কর্মী সম্মেলন। যে সম্মেলনে গঠিত হয় পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসছেন, এমন খবরে আওয়ামী মুসলিম লীগ একটা শোভাযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ওই সময় দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক একটু ব্যস্ত ছিলেন, তাঁর বিবাহের দিন ঘনিয়ে আসছিল। যে কারণে দলের সমস্ত কাজ যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকেই করতে হতো। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ‘‘তিনি (শামসুল হক) আমাকে বললেন, প্রতিষ্ঠানের কাজ তুমি চালিয়ে যাও। আমাদের মধ্যে এতো মিল ছিলো যে কোন ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাই ছিলো না। আমি বুঝতে পারতাম মওলানা (সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী) সাহেব, হক সাহেবকে অপছন্দ করতে শুরু করেছেন। সুযোগ পেলেই তাঁর বিরুদ্ধে বলতেন। আমি চেষ্টা করতাম, যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয়। ”

লেখক : সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন