ঘোড়াঘাটে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হা ডু ডু খেলা
ঘোড়াঘাটে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হা ডু ডু খেলা
- আপডেট সময় : ১০:২৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে

হারিয়ে যাচ্ছে একসময়ের ঐতিহ্য গ্রামীণ খেলাধুলা হাডুডু।একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের খোলা মাঠে জমত হাডুডুর আসর। চারপাশে দর্শকের ভিড়, খেলোয়াড়দের দম ধরে ছুটে চলা, প্রতিপক্ষের সীমানা ছুঁয়ে ফিরে আসার লড়াই আর দর্শকদের করতালিতে মুখর হয়ে উঠত পুরো গ্রাম। হাডুডুর সেই উত্তেজনা ছিল গ্রামীণ জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু সময় বদলেছে। বদলে গেছে বিনোদনের ধরনও। মাঠের জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কোথাও খেলার মাঠ পরিণত হয়েছে বসতবাড়ি বা অন্য কাজে ব্যবহৃত জায়গায়। নিয়মিত প্রতিযোগিতা নেই, নেই প্রশিক্ষণ কিংবা সংগঠিত পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে একসময়ের জনপ্রিয় হাডুডু এখন অনেক গ্রামেই স্মৃতির পাতায় ঠাঁই পেয়েছে।
ঘোড়াঘাট উপজেলার তিন নং সিংড়া ইউনিয়নের ভার্ণাপাড়া গ্রাম এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এক সময় যেখানে নিয়মিত হাডুডু খেলা হতো, সেই মাঠে এখন খেলোয়াড়ের সংখ্যা হাতে গোনা। প্রবীণদের কেউ কেউ পুরোনো দিনের কথা স্মরণ করলেও তরুণদের বড় একটি অংশের আগ্রহ আধুনিক খেলাধুলা ও মোবাইলনির্ভর বিনোদনের দিকে।
স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, আগে একটি হাডুডু ম্যাচকে ঘিরে শুধু খেলোয়াড় নয়, পুরো গ্রামের মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। দূর-দূরান্তের দল আসত। খেলা দেখতে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের ভিড় জমত। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল।
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ ফয়েজ উদ্দিন বলেন, “আগে হাডুডু ছিল গ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। বিকেল হলেই ছেলেরা মাঠে চলে যেত। এখন মাঠে খেলোয়াড়ের চেয়ে মোবাইল হাতে তরুণের সংখ্যা বেশি।”
প্রবীণ হাডুডু খেলোয়াড় মোহাম্মদ মোকসেদ আলী বলেন, “খেলার আগ্রহ এখনো আছে। কিন্তু নিয়মিত মাঠ, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও প্রতিযোগিতা না থাকায় অনেকেই আর ধরে রাখতে পারছে না।”
আরেক প্রবীণ খেলোয়াড় মোহাম্মদ আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “এক সময় আমরা যুবকরা বিকেল হলেই হাডুডু খেলার জন্য খেলার মাঠে ছুটে যাই। এটা ছিল একটা আসক্ত।হাডুডু খেলোয়াড়দের ঝোঁক ও উদ্যম ছিল এবং আলাদা সম্মান ছিল। এখন এই খেলার সম্মান নেই। ভবিষ্যৎ আছে—এমন ধারণা তরুণদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে না।”
শুধু একটি খেলা নয়, হারাচ্ছে একটি সংস্কৃতি!!হাডুডু শুধু শরীরচর্চার খেলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ সমাজের সামাজিক বন্ধন, আনন্দ ও লোকজ সংস্কৃতি। একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে পরিচয় তৈরি হতো, তৈরি হতো সৌহার্দ্য ও প্রতিযোগিতার আবহ।
কিন্তু নিয়মিত আয়োজন বন্ধ হয়ে গেলে সেই সামাজিক বন্ধনও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাঠ না থাকলে খেলা হবে না, প্রতিযোগিতা না থাকলে খেলোয়াড় তৈরি হবে না—আর খেলোয়াড় না থাকলে একসময় ঐতিহ্যটিই হারিয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় শিক্ষক আফতাব উদ্দিন সরকার বলেন, আমি একজন হাডুডু প্রেমি ছিলাম এবং বিভিন্ন গ্রামে হাডুডু খেলার মাঠে খেলার রক্ষণশীল হিসেবে অংশগ্রহণ করেছি। তাই আমি বলতে চাই,“শিশু-কিশোরদের শুধু পড়াশোনা বা প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আটকে রাখলে তাদের শারীরিক ও সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো ফিরিয়ে আনতে বিদ্যালয় ও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ প্রয়োজন।”
তবে এর দায় কার?হাডুডুর মতো লোকজ খেলাগুলো টিকিয়ে রাখতে শুধু খেলোয়াড়দের আগ্রহ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মাঠ সংরক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত টুর্নামেন্ট, প্রশিক্ষণ, পুরস্কার ও পৃষ্ঠপোষকতা। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্রীড়া সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগও জরুরি।
স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক মোঃ জয়নাল আবেদীন বলেন, “বছরে একবার কোনো অনুষ্ঠান করলেই ঐতিহ্যবাহী খেলা বাঁচবে না। নিয়মিত প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।”
এ বিষয়ে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক বলেন, “হাডুডুসহ গ্রামীণ খেলাগুলোকে ধরে রাখতে পরিকল্পিতভাবে প্রতিযোগিতার আয়োজন ও মাঠ ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ রুবানা তানজিন বলেন, “ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। হাডুডু যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।”
এখনোই উদ্যোগ না নিলে প্রযুক্তির অগ্রগতি থামবে না, তরুণদের বিনোদনের ধরনও বদলাবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়েও নিজস্ব ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত উদ্যোগ ও বাস্তব পৃষ্ঠপোষকতা।
গ্রামবাংলার মাঠে আবার কি ফিরবে সেই ‘হাডুডু’ হাঁক? ফিরবে কি দর্শকের উচ্ছ্বাস? নাকি অযত্ন, মাঠ সংকট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হাডুডু একদিন শুধু প্রবীণদের স্মৃতিচারণের বিষয় হয়ে থাকবে? ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই হাডুডুকে বাঁচানোর উদ্যোগ এখন আগামী প্রজন্ম হয়তো জানবেই না একসময় গ্রামের মাটিতে এই ফেলা কতটা উৎস






















