তেঁতুলিয়ায় ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ তছরুপ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ইউপি সদস্যদের
- আপডেট সময় : ১১:০৩:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬ ৩৮ বার পড়া হয়েছে

তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়) প্রতিনিধিঃ তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদ তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন ইউপি সদস্যরা। অভিযোগের প্রেক্ষিতে সহকারী কমিশন ভুমি এসএম আকাশকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলো উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জীবন ইসলাম ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলম।
চেয়ারম্যান তার অনিয়ম ঢাকতে ও নিজের চেয়ার বাঁচাতে ইউপি সদস্যসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের ঘিরে ফেসবুকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ তোলার অভিযোগও উঠেছে।
জানা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম ইউনিয়ন পরিষদ তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ সহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম এবং সরকারি সহায়তার বরাদ্দের অর্থ নিজের খেয়াল খুশি মতো উত্তোলনের করেন। সে সব হিসাব ইউপি সদস্যরা চাইলে তাদের হিসাব না দিয়ে উল্টো হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ ইউপি সদস্যদের উপর।
একাধিক ইউপি সদস্য অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যান তাদেরকে কোণঠাসা করে রাখতেন এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হতো না। একই ব্যক্তির নামে একাধিকবার বরাদ্দ দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের ঘটনারও দাবি করেন তারা। ইউপি সদস্যগণ আরও অভিযোগ, তাদের নিয়মিত সম্মানী ভাতা প্রদান করা হতো না। এমন কি ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাক্সের অর্থ উত্তোলন করেও আত্মসাৎ করার অভিযোগ তুলেন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। নিজে প্রকল্প চেয়ারম্যান না হয়েও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ তুলে নিজ বাসভবনে বসেই সেই অর্থ বণ্টন করতেন বলেও অভিযোগ ওঠেছে। এছাড়া তিনি ইউপি সদস্যের নিয়ে বিভিন্ন সময় ফেসবুকে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে তাদের হয়রানী করাসহ একাধিক অভিযোগ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে আর্থিক সহায়তার নামে প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বিতরণের তথ্য ক্যাশ বইয়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তির আবেদনপত্র, অনুমোদন বা হিসাব রেজিস্টার পাওয়া যায়নি। এছাড়া আপ্যায়ন বাবদ প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা, স্টেশনারি বাবদ প্রায় ২ লক্ষ ৪৬ হাজার টাকা, কর আদায় কমিশন প্রায় ২ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা ও গাড়ি মেরামত খাতে প্রায় ১ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকার বিল -ভাউচার ও ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই উত্তোলনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এমনকি বিধিমালা অনুযায়ী সংরক্ষণযোগ্য হিসাব রেজিস্টারও রাখা হয়নি। পরিষদের অনুমোদন ও যথাযথ প্রমাণপত্র ছাড়াই বিভিন্ন ব্যক্তির নামে চিকিৎসা সহায়তা দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
ইউপি সদস্য হারুন অর রশিদ বলেন, ইউপি সদস্য হিসেবে যে সম্মান বা মর্যাদা পাওয়ার কথা সেই মর্যাদা টুকু দেয়নি আমাদের চেয়ারম্যান। তিনি তার খেয়াল খুশিমতো কাজ করেন৷ তিনি ভিজিএফসহ বিভিন্ন উপকার ভোগি কার্ড বিতরনের সময় নামমাত্র কয়েকটি কার্ড বিতরনের জন্য আমাদের দিতেন। বাকি সবগুলো তিনি তার মতো করে বিতরন করেন। তিনি পরিষদের অর্থ বিভিন্ন নামে-বে-নামে উত্তোলন করেন৷ ব্যাংকে উত্তোলন করার মতো কোন টাকা থাকলে তিনি উত্তোলন করে ফাঁকা করে দেন৷ তাছাড়া কিছু হলেই তিনি ফেসবুকে লাইভে চলে যান৷ আমরা এসবের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত চাই। চেয়ারম্যানের অনিয়ম ও দুর্নীতির শেষ নেই৷ তিনি একেক জনের নামে বার বার বরাদ্দ দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেন৷ তিনি আমাদের ইউপি সদস্যদের রেখে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
এদিকে আমিনুর রহমান নামে আরেক ইউপি সদস্য বলেন, আমরা যে প্রজেক্ট করতাম সেই টাকা চেয়ারম্যান সাহেব তুলে বাড়িতে নিয়ে আসতো৷ সেখান থেকে ১৫% টাকা কাটে নিত। তিনি আমাদের ইউপি সদস্যদের যে ভাতা সেখানেও তিনি ভাগ বসিয়ে কেটে নিয়েছেন।
ফেসবুকে বিভ্রান্তকর তথ্য ও ফেসবুক অপপ্রচারের বিষয়ে জানতে চাইলে ভজনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন বলেন, আশরাফুল চেয়ারম্যান যেটা করেছে সেটা ঠিক করেননি৷ সে যেটা করছে সেটা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে৷ তেঁতুলিয়া উপজেলার সম্মানহানী হলো। তার সমস্যা হয়েছে বলতে পারতো, সবাই বসে সমাধান করা যেতো৷ ইউএনও মহাদয় ভাল মানুষ৷ আমরা শতভাগ কাজ করার পর তদন্ত করা হয় পরে আমাদের বিল দেয়া হলে আমরা বিল উত্তোলন করি।
উল্লেখ্য যে, গত বছর ডিসেম্বর মাসে ‘ডেভিল হ্যান্ড’ অভিযানে চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পুনরায় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের চেষ্টা করেন তবে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এতে রাগের বষিভূত হয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগ তোলেন। এছাড়াও অন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেন। এতে উপজেলার অন্য ৬টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান৷
এদিকে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন মেম্বাররা তো একটা নয় একাধিক অভিযোগ করেছে আমার বিরুদ্ধে আবার তারা নিজেরাই প্রত্যাহার করেছে। ফেসবুক লাইভের জানতে চাইলে তিনি বলেন এটা দিয়েছি নরমাল ঈদের পর ফেসবুকে দিবো বোমা। উল্টো ইউএনও হাতে হয়রানি ও ঘুষ ছাড়া প্রকল্প পাস না করার অভিযোগ করেন৷
এ বিষয়ে তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, শালবাহান চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত করা হয়েছে এবং চলমান রয়েছে৷ তিনি আরও বলেন, থানা পুলিশ কর্তৃক চেয়ারম্যান গ্রেফতার হয়ে জেল হাজতে থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে চলমান ৪টি ফৌজদারী মামলার বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে লিখিতভাবে জানোনা হয়। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মসহ ইউনিয়ন পরিষদ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থি অভিযোগও রয়েছে।

























