তেঁতুলিয়ায় ইউএনওসহ ১৭ দপ্তরে কর্মকর্তাসহ জনবল সংকট স্থবির প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, নাগরিক সেবায় চরম বিপর্যয়
তেঁতুলিয়ায় ইউএনওসহ ১৭ দপ্তরে কর্মকর্তাসহ জনবল সংকট স্থবির প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, নাগরিক সেবায় চরম বিপর্যয়
- আপডেট সময় : ১১:৩৫:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে

দেশের সর্বউত্তরের সীমান্তবর্তী ও পর্যটনসমৃদ্ধ উপজেলা তেঁতুলিয়ায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তীব্র জনবল ও কর্মকর্তা সংকট এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে।
উপজেলার প্রশাসনিক অভিভাবক হিসেবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১৭টি সরকারি দপ্তরে শীর্ষ পদে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী কর্মকর্তা নেই। অতিরিক্ত ও ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সরকারি দপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা ও তৃণমূল পর্যায়ের সেবা কার্যক্রম। ফলে মাঠপর্যায়ে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, জরুরি চিকিৎসাসেবা, কৃষি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সুরক্ষা এবং দৈনন্দিন সরকারি নাগরিক সেবা পেতে গিয়ে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় প্রায় দুই লাখ বাসিন্দা।
অভিভাবকহীন উপজেলা প্রশাসনে থমকে আছে মূল সমন্বয় ও উন্নয়ন উপজেলার সার্বিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সরকারি নীতি বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি হলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। তিনি একাধারে উপজেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সকল উন্নয়ন প্রকল্প ও এডিপি (ADP) ফান্ডের তদারকি করেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ, মাদক ও বাল্যবিয়ে রোধসহ সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখেন। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিতরণ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে আন্তঃদপ্তর সমন্বয় রক্ষা, ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ নিরসনে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন।
কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পদটি ৬ জুলাই থেকে শূন্য রয়েছে। প্রথমে এক মাস পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহমিদা সুলতানা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে রুটিন দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস. এম আকাশ। পূর্ণাঙ্গ কর্মকর্তা না থাকায় একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ও উন্নয়ন ফাইল আটকে আছে। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদটিও দীর্ঘদিন খালি থাকায় দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও নথি ব্যবস্থাপনায় চরম দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতেও রয়েছে ভয়াবহ বিপর্যয় নেই কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট। তীব্র সংকটে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদটি শূন্য থাকায় একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে রোগী দেখার পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবার জন্য জুনিয়র কনসালটেন্টের ১০টি পদের মধ্যে ৯টি পদই শূন্য, কর্মরত আছেন মাত্র ১ জন। অন্যদিকে মেডিকেল অফিসার ও সমমানের ২৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন, বাকি ১৭টি পদই শূন্য। প্রসূতি সেবার জন্য মিডওয়াইফের ৭টি পদ ২টি খালি। এছাড়া রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও সমমানের ২০টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১২ জন এবং ৮টি পদ শূন্য রয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারী পদ ২১ জন আছে ৯ জন। তৃতীয় শ্রেনির পদ ৩৭ জনে আছে ১৩ জন, চতুর্থ শ্রেনি পদে ২৮ জনে আছে ১৭ জন। ফলে প্রয়োজনীয় জনবল ও বিশেষজ্ঞের অভাবে কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অপারেশন থিয়েটার অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হতে বসেছে।
একই অবস্থা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগেও। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা—উভয় পদই শূন্য থাকায় একজন মেডিকেল অফিসার অতিরিক্ত হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করছেন। এতে মাঠপর্যায়ে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী বিতরণের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষি খাতেও রয়েছে স্থবিরতা, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার ২টি পদের মধ্যে একজন সম্প্রতি বদলি হয়েছেন এবং অপরজন ৩ মাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে রয়েছেন। অতিরিক্ত কৃষি সম্প্রসরন কর্মকর্তার একটি পদও শুন্য রয়েছে। এছাড়া উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি অফিসারের পদও শুন্য দীর্ঘদিন। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সরাসরি পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার ২১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন, ১১টি পদই শূন্য। ফলে সীমান্তবর্তী এ জনপদে কৃষিসেবা ও প্রণোদনা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরে একজন সহকারী প্রকৌশলীর পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। দ্বিতীয় শ্রেণির উপ-সহকারী প্রকৌশলীর ৩টি পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ১ জন, ২টি পদ শূন্য এবং নকশাকারের ১টি পদও দীর্ঘদিন ধরে খালি। এতে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজের প্রাক্কলন ও তদারকি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা অফিসারের ৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১ জন। উচ্চমান সহকারীর পদ, অফিস সহকারী ২টি পদ ফাঁকা, অফিস সহায়কের পদও ফাঁকা রয়েছে দীর্ঘদিন যাবত। ফলে উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর নিয়মিত পরিদর্শন ও শিক্ষার মান তদারকি ব্যাহত হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও নারী উন্নয়ন কার্যক্রমও স্থবির তৃণমূলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সুরক্ষায় সরকারি বিভিন্ন সেবা প্রদানে নিয়োজিত উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে ৩০ জুলাই স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। এরপর থেকে সেখানে কোনো স্থায়ী কর্মকর্তা যোগদান করেননি এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে কে আছেন, সেটিও জানা নেই কারও। ফলে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা, জটিল রোগীদের আর্থিক অনুদান, বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম এবং সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ (RSS/RMC) সংক্রান্ত কার্যক্রম চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
অন্যদিকে, মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ে কোনো স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীও কর্মরত নাই। আটোয়ারী উপজেলার কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সপ্তাহে এক-দুদিন এসে দায়সারাভাবে অফিস পরিচালনা করেন। ফলে মাতৃত্বকালীন ভাতা, ভিডব্লিউবি (VWB) খাদ্য সহায়তা, আইজিএ দক্ষতা প্রশিক্ষণ, বাল্যবিয়ে রোধ এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের স্পর্শকাতর কাজগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে।
উপজেলা নির্বাচন অফিসারের মূল পদটিও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বর্তমানে সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এই পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন ও স্থানান্তর কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা—উভয় পদই শূন্য থাকায় মাছ চাষীদের কারিগরি সহায়তা ও পোনা বিতরণ কার্যক্রম থমকে আছে।
স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় জমি কেনাবেচা, দলিল সম্পাদন ও সরকারের বিপুল রাজস্ব আদায়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা না থাকায় গ্রামীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও সদস্যদের প্রশিক্ষণ সমন্বয় শিথিল হয়ে পড়েছে।
উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা না থাকায় কৃষি ও অর্থনৈতিক শুমারির জাতীয় তথ্যভাণ্ডার হালনাগাদ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন অফিসারের পদটিও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় জরুরি উদ্ধার তৎপরতা ও অগ্নি নির্বাপণে তদারকির ঘাটতি রয়েছে।
দেশের সবচেয়ে শীতপ্রবণ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া অফিসে কোনো আবহাওয়াবিদ কিংবা স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই। ফলে কোটি কোটি টাকা মূল্যের সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি ও আধুনিক অবকাঠামো অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি প্রশাসনেও জনবল সংকটে রয়েছে। বাংলাবান্ধা, তিরনইহাট ও দেবনগর ৩টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কোনো ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) নেই। ফলে নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, খাসজমি তদারকি ও সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তিতে হাজার হাজার সাধারণ ভূমিমালিক সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন।
বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদটি আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর অধ্যুষিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদটি শূন্য থাকায় নাগরিক সনদ, ট্রেড লাইসেন্স ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে জনভোগান্তি চরম।
জনদুর্ভোগ ও দ্রুত পদক্ষেপের দাবি
প্রশাসনিক অচলাবস্থা প্রসঙ্গে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সেবাগ্রহীতারা জানান, একটি সাধারণ সেবা বা স্বাক্ষরের জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ অফিসে এসে ফিরে যেতে হয়। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজ কর্মস্থল সামলে এখানে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না।
সীমান্তবর্তী এই উপজেলার প্রান্তিক মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে এবং থমকে যাওয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে ইউএনও-সহ সকল শূন্য পদে অবিলম্বে স্থায়ী কর্মকর্তা ও জনবল পদায়নের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের শীর্ষ মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিক সমাজ।
























