সংবাদ শিরোনাম ::
ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল বৈরী আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও অবৈধ জালে সংকটে সুন্দরবন উপকূলের মৎস্য অর্থনীতি সাগরে নেই ট্রলার, আড়তে নেই মাছ বানারীপাড়ায় বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম রকি তেতলা পিজিএস স্কুলের সভাপতি বরিশালে সিভিল সার্জনের অপসারনের দাবীতে কক্ষে তালা বাবুগঞ্জে মাদক, চুরি-ডাকাতি ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক সভা। বানারীপাড়ায় চাঁদাবাজি মামলায় জামিনে বের হয়ে বাদীসহ তিনজনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম ঝালকাঠিতে গৃহবধূ মলিনা রায় হত্যা: মামলার দ্বিতীয় আসামি ঢাকায় গ্রেফতার সড়কে ঝড়লো সাংবাদিক পুত্রের প্রাণ, বিএমএসএফ’র শোক বাবুগঞ্জে ১ কেজি গাঁজাসহ তিন মাদক কারবারি আটক ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ত্রিমুখী সংঘর্ষে রিকসা চালক নিহত, আহত-১০ ​ঝালকাঠিতে ‘ফ্রি নিউজ গ্রুপ’-এর সাংবাদিকদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত

ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল বৈরী আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও অবৈধ জালে সংকটে সুন্দরবন উপকূলের মৎস্য অর্থনীতি সাগরে নেই ট্রলার, আড়তে নেই মাছ

ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল বৈরী আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও অবৈধ জালে সংকটে সুন্দরবন উপকূলের মৎস্য অর্থনীতি সাগরে নেই ট্রলার, আড়তে নেই মাছ

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট
  • আপডেট সময় : ০২:৪৮:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ইলিশের ভরা মৌসুম। অথচ জেলেদের জালে উঠছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। আড়তে নেই পর্যাপ্ত সরবরাহ, বাজারে আকাশছোঁয়া দাম। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে এবার ইলিশ সংকট উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বঙ্গোপসাগরে একের পর এক লঘুচাপ, নিম্নচাপ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় সাগর উত্তাল থাকায় অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদী-মোহনায় অবৈধ বেহুন্দি জালের বিস্তার এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সীমিত সক্ষমতা সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ফলে শুধু ইলিশ নয়, পুরো উপকূলীয় মৎস্য অর্থনীতিই চাপে পড়েছে।

একসময় সুন্দরবনসংলগ্ন পানগুছি-বলেশ্বর নদ ছিল রুপালি ইলিশের অফুরন্ত ভাণ্ডার। আষাঢ়-শ্রাবণ এলেই মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার বাজার জমে উঠত টাটকা ইলিশের বেচাকেনায়। জেলেদের নৌকা ভিড়ত মাছভর্তি হয়ে, ক্রেতারা হালি ধরে ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরতেন। সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত।

স্বাদে-গন্ধে অনন্য পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশ

দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর মধ্যে পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশের রয়েছে বিশেষ সুনাম। স্বাদ, গন্ধ, তেলের পরিমাণ এবং আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এ ইলিশ দীর্ঘদিন ধরেই ভোজনরসিকদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এ নদীর ইলিশের পেটি তুলনামূলক চওড়া এবং তেলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এর স্বাদ অন্য নদীর ইলিশের চেয়ে আলাদা।

বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন,“বাজারে ইলিশ খুব কম আসে। যা পাওয়া যায় তার দাম এত বেশি যে সাধারণ পরিবারের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়।”

“নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কয়েক হাজার টাকা দিয়ে ইলিশ কেনা এখন স্বপ্নের মতো।”

জালে নেই আগের মতো মাছ

মোরেলগঞ্জ এলাকার পানগুছির জেলে খলিল জানান, কয়েক বছর আগেও বলেশ্বর নদে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। এখন জাল ফেলেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।

তিনি বলেন, “দু-একটি ছোট ইলিশ পাওয়া গেলেও বড় ইলিশ খুব কম ধরা পড়ে। নদীতে আগের মতো মাছ নেই।”

জেলে ও ট্রলার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দীর্ঘ সময় সাগর উত্তাল থাকায় অধিকাংশ ট্রলার গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না। অনেক ট্রলার মাঝপথ থেকে ফিরে আসছে। কয়েকদিন সাগরে অবস্থান করেও কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় জ্বালানি খরচ পর্যন্ত উঠছে না।

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে ইলিশের পথ

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার পরিবর্তন এবং উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক অভিবাসন ও বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আগের মতো বড় ঝাঁকে ইলিশ নদী-মোহনায় প্রবেশ করছে না।

তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইতোমধ্যেই উপকূলীয় মৎস্যসম্পদে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

অবৈধ জালে রুদ্ধ ইলিশের চলাচল

স্থানীয় জেলে, আড়তদার ও ট্রলার মালিকদের অভিযোগ, পশুর, বলেশ্বরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন নদী-মোহনায় এখনও অবাধে ব্যবহার হচ্ছে বেহুন্দি জাল ও অন্যান্য নিষিদ্ধ জাল। এসব জালে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরা পড়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান থাকলেও প্রভাবশালী চক্রের কারণে অনেক এলাকায় অবৈধ জাল পুরোপুরি অপসারণ করা যাচ্ছে না। ফলে সাগর থেকে নদীতে প্রবেশের আগেই বিপুল পরিমাণ মাছ আটকা পড়ছে।

ভারতীয় ট্রলারের অনুপ্রবেশের অভিযোগ

স্থানীয় জেলেরা অভিযোগ করেছেন, বঙ্গোপসাগরের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় ট্রলারের অনুপ্রবেশও মৎস্যসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাদের দাবি, শুধু বাংলাদেশের জলসীমায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশ সংরক্ষণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও অভিন্ন সংরক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আড়তে নেই মাছ, বাজারে রেকর্ড দাম

ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। ৮০০ গ্রামের ইলিশের দাম ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। ফলে জাতীয় মাছ ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভরা মৌসুমে যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইলিশ বিক্রি হওয়ার কথা, সেখানে এখন সরবরাহ নেমে এসেছে কয়েক গুণ কম। চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতায় বাজারে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছে।

কী বলছে মৎস্য ও বন বিভাগ

মোরেলগঞ্জ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা রণজিৎ কুমার বলেন, “সাগর ও পানগুছি-বলেশ্বর নদে পর্যাপ্ত ইলিশ রয়েছে। ভাদ্র-আশ্বিনে মূল মৌসুম শুরু হলে সরবরাহ আরও বাড়বে। বর্তমানে মৌসুমের শুরুতে মাছ কম ধরা পড়ায় দাম বেশি রয়েছে।”

জেলা মৎস্য বিভাগ ও সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অবৈধ জাল, নদী-মোহনায় প্রতিবন্ধকতা এবং পরিবেশগত পরিবর্তন ইলিশ উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় আরও কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা, অবৈধ জাল উচ্ছেদ এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা জরুরি।

অন্যদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, কঠোর সংরক্ষণ নীতি বাস্তবায়নের আগে হাজার হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ মৎস্য আহরণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং সীমিত নজরদারির কারণে ইলিশের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র হুমকির মুখে পড়ছে।

তাদের মতে, অবৈধ জাল নির্মূল, নদী-মোহনায় কঠোর নজরদারি, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

ভরা মৌসুমেও যখন জালে ইলিশ উঠছে না, তখন সুন্দরবন উপকূলের হাজারো জেলে পরিবারের একটাই প্রশ্ন—সমুদ্রে মাছ ফিরবে কবে, আর তাদের জীবনে স্বস্তি ফিরবে কবে?ছবি সংযুক্ত

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল বৈরী আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও অবৈধ জালে সংকটে সুন্দরবন উপকূলের মৎস্য অর্থনীতি সাগরে নেই ট্রলার, আড়তে নেই মাছ

ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল বৈরী আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও অবৈধ জালে সংকটে সুন্দরবন উপকূলের মৎস্য অর্থনীতি সাগরে নেই ট্রলার, আড়তে নেই মাছ

আপডেট সময় : ০২:৪৮:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

ইলিশের ভরা মৌসুম। অথচ জেলেদের জালে উঠছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। আড়তে নেই পর্যাপ্ত সরবরাহ, বাজারে আকাশছোঁয়া দাম। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে এবার ইলিশ সংকট উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বঙ্গোপসাগরে একের পর এক লঘুচাপ, নিম্নচাপ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় সাগর উত্তাল থাকায় অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদী-মোহনায় অবৈধ বেহুন্দি জালের বিস্তার এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সীমিত সক্ষমতা সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ফলে শুধু ইলিশ নয়, পুরো উপকূলীয় মৎস্য অর্থনীতিই চাপে পড়েছে।

একসময় সুন্দরবনসংলগ্ন পানগুছি-বলেশ্বর নদ ছিল রুপালি ইলিশের অফুরন্ত ভাণ্ডার। আষাঢ়-শ্রাবণ এলেই মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার বাজার জমে উঠত টাটকা ইলিশের বেচাকেনায়। জেলেদের নৌকা ভিড়ত মাছভর্তি হয়ে, ক্রেতারা হালি ধরে ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরতেন। সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত।

স্বাদে-গন্ধে অনন্য পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশ

দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর মধ্যে পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশের রয়েছে বিশেষ সুনাম। স্বাদ, গন্ধ, তেলের পরিমাণ এবং আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এ ইলিশ দীর্ঘদিন ধরেই ভোজনরসিকদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এ নদীর ইলিশের পেটি তুলনামূলক চওড়া এবং তেলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এর স্বাদ অন্য নদীর ইলিশের চেয়ে আলাদা।

বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন,“বাজারে ইলিশ খুব কম আসে। যা পাওয়া যায় তার দাম এত বেশি যে সাধারণ পরিবারের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়।”

“নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কয়েক হাজার টাকা দিয়ে ইলিশ কেনা এখন স্বপ্নের মতো।”

জালে নেই আগের মতো মাছ

মোরেলগঞ্জ এলাকার পানগুছির জেলে খলিল জানান, কয়েক বছর আগেও বলেশ্বর নদে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। এখন জাল ফেলেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।

তিনি বলেন, “দু-একটি ছোট ইলিশ পাওয়া গেলেও বড় ইলিশ খুব কম ধরা পড়ে। নদীতে আগের মতো মাছ নেই।”

জেলে ও ট্রলার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দীর্ঘ সময় সাগর উত্তাল থাকায় অধিকাংশ ট্রলার গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না। অনেক ট্রলার মাঝপথ থেকে ফিরে আসছে। কয়েকদিন সাগরে অবস্থান করেও কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় জ্বালানি খরচ পর্যন্ত উঠছে না।

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে ইলিশের পথ

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার পরিবর্তন এবং উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক অভিবাসন ও বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আগের মতো বড় ঝাঁকে ইলিশ নদী-মোহনায় প্রবেশ করছে না।

তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইতোমধ্যেই উপকূলীয় মৎস্যসম্পদে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

অবৈধ জালে রুদ্ধ ইলিশের চলাচল

স্থানীয় জেলে, আড়তদার ও ট্রলার মালিকদের অভিযোগ, পশুর, বলেশ্বরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন নদী-মোহনায় এখনও অবাধে ব্যবহার হচ্ছে বেহুন্দি জাল ও অন্যান্য নিষিদ্ধ জাল। এসব জালে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরা পড়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান থাকলেও প্রভাবশালী চক্রের কারণে অনেক এলাকায় অবৈধ জাল পুরোপুরি অপসারণ করা যাচ্ছে না। ফলে সাগর থেকে নদীতে প্রবেশের আগেই বিপুল পরিমাণ মাছ আটকা পড়ছে।

ভারতীয় ট্রলারের অনুপ্রবেশের অভিযোগ

স্থানীয় জেলেরা অভিযোগ করেছেন, বঙ্গোপসাগরের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় ট্রলারের অনুপ্রবেশও মৎস্যসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাদের দাবি, শুধু বাংলাদেশের জলসীমায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশ সংরক্ষণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও অভিন্ন সংরক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আড়তে নেই মাছ, বাজারে রেকর্ড দাম

ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। ৮০০ গ্রামের ইলিশের দাম ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। ফলে জাতীয় মাছ ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভরা মৌসুমে যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইলিশ বিক্রি হওয়ার কথা, সেখানে এখন সরবরাহ নেমে এসেছে কয়েক গুণ কম। চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতায় বাজারে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছে।

কী বলছে মৎস্য ও বন বিভাগ

মোরেলগঞ্জ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা রণজিৎ কুমার বলেন, “সাগর ও পানগুছি-বলেশ্বর নদে পর্যাপ্ত ইলিশ রয়েছে। ভাদ্র-আশ্বিনে মূল মৌসুম শুরু হলে সরবরাহ আরও বাড়বে। বর্তমানে মৌসুমের শুরুতে মাছ কম ধরা পড়ায় দাম বেশি রয়েছে।”

জেলা মৎস্য বিভাগ ও সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অবৈধ জাল, নদী-মোহনায় প্রতিবন্ধকতা এবং পরিবেশগত পরিবর্তন ইলিশ উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় আরও কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা, অবৈধ জাল উচ্ছেদ এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা জরুরি।

অন্যদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, কঠোর সংরক্ষণ নীতি বাস্তবায়নের আগে হাজার হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ মৎস্য আহরণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং সীমিত নজরদারির কারণে ইলিশের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র হুমকির মুখে পড়ছে।

তাদের মতে, অবৈধ জাল নির্মূল, নদী-মোহনায় কঠোর নজরদারি, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

ভরা মৌসুমেও যখন জালে ইলিশ উঠছে না, তখন সুন্দরবন উপকূলের হাজারো জেলে পরিবারের একটাই প্রশ্ন—সমুদ্রে মাছ ফিরবে কবে, আর তাদের জীবনে স্বস্তি ফিরবে কবে?ছবি সংযুক্ত