দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট আঞ্চলিক মহাসড়ক যেন ক্রমেই মৃত্যুঝুঁকির পথে পরিণত হচ্ছে। জনবহুল বাজার, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকায় বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচল করায় প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্যে নিরাপদে সড়ক পারাপার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনা ঘটছে, প্রাণ যাচ্ছে, আহত হচ্ছেন অনেকে। কিন্তু দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্নের জবাব মিলছে না।
চারটি স্থানকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
সরেজমিন অনুসন্ধান এবং স্থানীয়দের অভিযোগে ঘোড়াঘাট অংশের অন্তত চারটি স্থানকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলো হলো—ঘোড়াঘাট আজাদ মোড়, এলাকার পলাশবাড়ী মোড়, খেতাম মোড়, নিতাই সাহা পুকুর,ফিলিং স্টেশন মোড়, টিএনটি মোড়, হরিপাড়া হাটের কানাগাড়ি মোড়, উপজেলার বৃহত্তম রানীগঞ্জ বাজার, গুচ্ছগ্রাম এলাকা এবং বিরাহিমপুর গুচ্ছগ্রাম।
এসব স্থানে বাজার, মোড় ও জনসমাগম থাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ মহাসড়ক পারাপার করেন।
অথচ দ্রুতগতির যানবাহনের কারণে তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ঘোড়াঘাট পৌর এলাকার পলাশবাড়ী মোড়, কান্দিয়া মোড় ও খেতাম মোড় এলাকায় জনসমাগম বেশি। ফলে এ সমস্ত এলাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি।রানীগঞ্জ বাজার এলাকায় চার থেকে পাঁচটি মোড় রয়েছে।হাটের দিনে মানুষের চাপ ও স্থানীয় সড়ক থেকে যানবাহন মহাসড়কে ওঠার সময় সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। হরিপাড়া হাট ও কানাগাড়ি মোড়ে হাটের দিন মানুষের চাপ বাড়ে। গুচ্ছগ্রাম ও টিএন্ডটি মোড়েও স্থানীয় মানুষের চলাচল রয়েছে। এসব স্থানে গতিসীমা নির্দেশক, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, নিরাপদ পারাপার ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
দুর্ঘটনায় প্রাণহানির একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঘোড়াঘাট পৌরসভার আজাদ মোড়ে ইসলামী ব্যাংকের সামনে দ্রুতগতির কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় আল-আমিন নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। ১১ এপ্রিল দামোদরপুর-শৌওলা এলাকায় ট্রাক ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হন।
২৩ মে রানীগঞ্জ বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে তিন যুবকের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ প্রকাশিত দুর্ঘটনার বিবরণগুলোর মধ্যে ২১ আগস্ট ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মা ও নয় বছর বয়সী মেয়ের মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে।এ ঘটনাগুলো শুধু দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়, বরং মহাসড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
দুর্ঘটনার হিসাবেও রয়েছে উদ্বেগ।
২০২৬ সালের ৭ জুন প্রকাশিত একটি স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদনে ঘোড়াঘাট ফায়ার সার্ভিসের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, ওই বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত উপজেলায় ১২টি দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত এবং ১৭ জন আহত হন। থানা সূত্রে পাঁচটি দুর্ঘটনাসংক্রান্ত মামলার তথ্য উল্লেখ করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, ছোট-বড় মিলিয়ে দুর্ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তবে এই হিসাবকে পুরো এক বছরের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আঞ্চলিক মহাসড়কে যানবাহনের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে সাইনবোর্ড, গতিসীমা নির্দেশক এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিড ব্রেকার স্থাপনের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হোক। চালকদেরও নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলতে হবে।:
জনবহুল এলাকায় বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচল কোনোভাবেই কাম্য নয়। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, পুলিশ প্রশাসন ও সড়ক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া যানবাহন চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো দরকার। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
প্রশ্ন একটাই—প্রাণহানির পরই কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
সচেতন মহলের দাবি, পলাশবাড়ী মোড়, আজাদ মোড়, টিএনটি মোড়, গুচ্ছগ্রাম, রানীগঞ্জ বাজার, ও হরি পাড়া কানাগাড়ী সহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত গতিসীমা নির্ধারণ, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, নিরাপদ পারাপার, প্রয়োজনীয় গতিরোধক এবং নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে গত এক বছরের দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, দুর্ঘ
টনার কারণ অনুসন্ধান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মানুষের জীবন রক্ষায় আর কত প্রাণহানি ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—ঘোড়াঘাটবাসীর প্রশ্ন এখন সেখানেই।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ বেল্লাল তালুকদার
প্রধান কার্যালয় ফ্লাট#এ ৫ ট্রফিকাল হোম ৫৫/৫৬ শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন রোড মগবাজার রমনা ঢাকা-১২১৭
মোবাইল নং- 01712573978
ই-মেইল:- ajkercrimenews@gmail.com
Copyright © 2026 আজকের ক্রাইম নিউজ. All rights reserved.