বেতাগী (বরগুনা) প্রতিনিধি ॥ বেতাগীতে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিতে আসা প্রশিক্ষণার্থী ও মাতৃত্বকালীন দরিদ্র মায়েদের ভাতা প্রদানে নয়-ছয়, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, দায়িত্বে অবহেলাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, গ্রামীণ নারী জনগোষ্ঠীকে আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অফিসে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ট্রেডে ৩ মাস মেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য দর্জি বিজ্ঞান ৩০, ব্লকবাটিক এবং বিউটি পার্লার ট্রেডের প্রতি ব্যাচে ২৫ জন করে ৮০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একটি ট্রেডের প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ওই প্রশিক্ষণার্থীকে অন্য একটি ট্রেডে আবার প্রশিক্ষণ করানোর এমনও অভিযোগ রয়েছে। দপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী সদ্য সমাপ্ত করা প্রশিক্ষণার্থীকে একই ট্রেড বা অন্য ট্রেডে ভর্তি করা নিয়ম নেই। তবুও সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে বিভিন্ন ট্রেডে নাম থাকা একাধিক জনকে প্রশিক্ষনের জন্য ভর্তি করানো হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগী প্রশিক্ষণার্থী অভিযোগ করেন, প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষনার্থীদের স্ব-স্ব ব্যাংক হিসেবে চেকের মাধ্যমে ভাতা দেওয়ার কথা। কিন্ত মহিলা বিষয়ক ওই কর্মকর্তা তা না করে নিজের ইচ্ছামতো রেজিস্ট্রার তৈরি এবং ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে শুধু ১০ টাকা মূল্যের রেভিনিউয়ের ওপর স্বাক্ষর রেখে টাকা প্রদান করেন।
দর্জি বিজ্ঞান ট্রেডে প্রশিক্ষনার্থীদের দৈনিক ১০০ টাকা করে প্রশিক্ষণ শেষে ৬ হাজার টাকা, ব্লকবাটিক এবং বিউটি পার্লার ট্রেডে দৈনিক ২০০ টাকা করে প্রশিক্ষণ শেষে ১২ হাজার টাকা ভাতা প্রদানের সরকারি নীতিমালায় থাকলেও তা ভঙ্গ করে ওই কর্মকর্তা সিংহভাগ টাকা কর্তন করে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ভাতাবঞ্চিত একাধিক প্রশিক্ষণার্থী অভিযোগ করেন, প্রশিক্ষণার্থীকে দুই হাজার ১০০ করে টাকা প্রদান করা হয়েছে। এমনও প্রশিক্ষণার্থী রয়েছে যাদের পুরো টাকা দেয়া হয়নি।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দর্জি বিজ্ঞান ট্রেডের প্রশিক্ষনার্থী লাকী আক্তার অভিযোগ করেন, ৬ হাজার টাকার স্থলে তিনি হাতে পেয়েছেন ২১০০ টাকা। করোনাকালীন ৩ মাসের প্রশিক্ষণ হয় ২০ থেকে ২৫ দিন। বাকি সময়ের টাকা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার পকেটে গেছে। এ ছাড়া কেউ ভর্তি হয়ে কাজ শিখতে আসে না। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে উপস্থিতির সংখ্যা খুবই হতাশাজনক। শুধু ভাতা নেওয়ার সময়ে এসে হাজিরা নিশ্চিত করে টাকা ভাগাভাগি করে নিয়ে যায়। ফলে প্রশিক্ষণে ভর্তিচ্ছুদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে ও ভাতা বঞ্চিত হচ্ছেন প্রশিক্ষণ নিতে আসা প্রশিক্ষণার্থীরা।
মাতৃত্বকীলীন দরিদ্র উপকারভোগি মায়েদের ভাতা প্রদানে অভিযোগ আরও বিস্তর। কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল কর্মসূচির ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২ হাজার টাকা এবং একই বছরে ৯ হাজার ৬০০ টাকা ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করে মোট ২১ হাজার ৬শ টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৯ হাজার ৬শ টাকা কাউকে না দিয়ে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
উপজেলার বুড়ামজুমদার ইউনিয়নের কাজির হাঁটের উকারভোগী মা মোসা. সীমা আক্তার জানান, ৯ হাজার ৬শ টাকা তিনি আজও হাতে পাননি। আশার কথা, ২০১৭ থেকে ২০১৯ দুই অর্থবছরে ভাতার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে ২৫ হাজার ২০০ টাকা করা হলেও দুর্ভাগ্য যে, ৩ শতাধিক দরিদ্র উপকারভোগী মায়েদের সিংহভাগ ভাতা এখনো হাতে পাননি, একাধিক মায়ের এমনই অভিযোগ।
বেতাগী সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বেতাগী হৃদয় দাস বলেন, ২ বছর আগে আমার স্ত্রীর মাতৃত্বকালীন ভাতা এখনও পায়নি। অফিসে একাধিক এই ভাতার টাকার জন্য গেলে মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা জানান বরাদ্দ নেই। আমি ভাতা না পেলে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে অভিযোগ করবো।
বেতগী সদরের শিল্পী, বিবিচিনির শাহনাজ, হোসনাবাদের মর্জিনা, মোকামিয়ার ছনিয়া, কাজিরাবাদের শিমু সকলের ক্ষেত্রেই একই চিত্র। এসব ভাতা বঞ্চিতদের বিভিন্ন অজুহাতের কথা বলে অফিস থেকে বিদায় দেন।
এছাড়াও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার কারণে ডাটা এন্টি না হওয়ায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২২৮ জন দরিদ্র উপকারভোগী মা ভাতা বঞ্চিত হন। এমনকি মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় সেবা নিতে আসা একাধিক সেবা গৃহীতারা অভিযোগ করেন, প্রায়শই তাকে পাওয়া যায় না। না পেয়ে তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
ইতোপূর্বে ভাতা বঞ্চিত একাধিক মহিলা ক্ষিপ্ত হয়ে তার কার্যালয় তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে এবং এর আগেও আর্থিকসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০১৬ সালে তাকে কাউখালী উপজেলায় বদলী ও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। কিন্ত ২০১৮ সালে পুনরায় একই কর্মস্থলে দেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দাপ্তরিক অনিয়মের অভিযোগে গত ২৪ অক্টোবর ঢাকা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর থেকে দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি তদন্ত করে গেলেও এখনো কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে দেড় লাখ জনসংখ্যা অধ্যূষিত উপকূলীয় বরগুনার বেতাগী উপজেলায় সরকারের অগ্রাধিকারমূলক এ মহৎ কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয় বরগুনা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মেহেরুন নাহার মুন্নি বলেন, তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সুপারিশ করা হবে।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহিনুর বেগম বলেন, কোনো কিছুই সত্য নয়। বরং আমার প্রতি অমানবিক ও অসাদাচাণ করা হচ্ছে। যে কারণে গত ৩ মাস যাবত আমার বেতন বন্ধ রয়েছে। এ জন্য ঢাকা থেকে তদন্তে এসেছিল। আমি এর সুরাহা চাই। অনুপস্থিতির প্রশ্নই আসে না। তবে দুটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সুহৃদ সালেহীন বলেন, তদন্ত কমিটির সদস্যরা তার কাছেও এসেছিলেন। তার দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয় প্রকাশেই মানুষ জানে। কর্মকর্তা হয়ে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর কতটা বলা যায়। সূত্র: কালের কন্ঠ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ বেল্লাল তালুকদার
প্রধান কার্যালয় ফ্লাট#এ ৫ ট্রফিকাল হোম ৫৫/৫৬ শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন রোড মগবাজার রমনা ঢাকা-১২১৭
মোবাইল নং- 01712573978
ই-মেইল:- ajkercrimenews@gmail.com
Copyright © 2026 আজকের ক্রাইম নিউজ. All rights reserved.